Sylhet Today 24 PRINT

আমার শিক্ষক উপেন্দ্র কুমার দাশ

সুশান্ত দাস প্রশান্ত |  ২৬ মে, ২০২৬

(১)
"ভাব আছে যার গায়/দেখলে তারে চেনা যায়" ভিক্ষু সাধু ফকির’র কথাগুলোর ন‍্যায় আমাদের শিক্ষাগুরু বাবু উপেন্দ্র কুমার দাশ। শিক্ষা ও শিক্ষকতায় আপাদমস্তক জাত শিক্ষক ছিলেন। উনার প্রথম পরিচয় শিক্ষক, শেষ পরিচয়ও শিক্ষক। শিক্ষকতাই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। শিক্ষকতাই করেছেন জীবনভর। শিক্ষকতার ভাবটা-ই যাপিত জীবনকে ছেদ করেছে। আর এ জায়গাটাই এলাকার ভুরি ভুরি শিক্ষকদের চেয়ে তফাৎ এবং অনন‍্য আসীন করেছে তাঁকে।

ভাটির অনন‍্য আলোকবর্তিকা গিরিধর উচ্চ বিদ্যালয়। একটা সময় গ্রাম ভরা ছন(বন) ঘর। নিরক্ষরতায় নিমজ্জিত সারা এলাকা। এমন পরিবেশ পরিস্থিতিকে ছাড়িয়ে কেউ কেউ শিক্ষার বার্তা নিয়ে উদ‍্যোগ নিলেও, সামাল দিয়ে, গুছিয়ে ওঠা দূরহ ব্যাপারে ছিল। সবশেষ শ্রদ্ধেয় বাবু মহেন্দ্র চন্দ্র দাশ তাঁর পিতৃদেব গিরিধর মড়লের নামে ‘গিরিধর উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন (১৯৫৮)। ঐ যে ‘কেউ কেউ শিক্ষার বার্তা নিয়ে উদ‍্যোগ এবং সবশেষ বাবু মহেন্দ্র মাস্টার দিয়ে সমাপ্ত’ এমন পরিস্থিতিতে যে ক’জন সাহায‍্যের সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের নাম, আজকের অনেকের জানার বাহিরে। তবে আলোকবর্তিকার প্রাণপুরুষ বাবু মহেন্দ্র’র ভাতিজা কমরেড শ্রীকান্ত দাশ, রাজনৈতিক সিদ্ধিপুরুষ হোমিও ডাক্তার শ্রদ্ধাষ্পদ কমরেড কৃপেন্দ্র বর্মন’র নামটি না জানলেই নয়।

গিরিধর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন উপেন্দ্র কুমার দাশ। আমরা ১৯৯২ সাল হতে স‍্যারকে পাই। যতোটুকু জানাযায় শ্রদ্ধাষ্পদ সর্বানন্দ বাবু (খালিয়াজুড়ি, যোগিমারা) গিরিধর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন। অতঃপর ৪র্থ তম প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু উপেন্দ্র কুমার দাশ।

(২)
শাল্লা কলেজে এক সময়ে ইংরেজি শিক্ষকের ঘাটতি ছিল (বর্তমানে শাল্লা সরকারি কলেজ) সেখানেও উপেন্দ্র স্যারের উপস্থিতি পরিলক্ষিত। এক সময় শাল্লা এক গল্লির বাজার ছিল। সময় ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বহু মানুষের সমাগমে এর বিস্তার ঘটে। শিক্ষকতার ভাব-মাখা গা, বাবু উপেন্দ্র স‍্যারের নজরে আসলে ঐসব বহু মানুষের সন্তান-সন্ততিদের জন‍্য শাল্লা কিন্ডার গার্ডেন এর প্রতিষ্ঠাতা সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে নিজেকে উপনীত করেন। তাইতো জন্মসূত্রে শাল্লার হবিবপুর ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের সাধারণ পরিবারের হলেও তাঁর অসীম কর্মযজ্ঞ ও অকৃত্রিম নিরলস শিক্ষাদানে নিজেকে শিক্ষকতার উপযুক্ত আসনে আসীন করতে পেরেছিলেন। শ্রদ্ধার প‍্যারামিটারে জায়গা করতে পেরেছেন।

মহেন্দ্র মাস্টারের কাল হতে গিরিধর স্কুলের সকল মঙ্গলার্থে শিক্ষকতার বাইরেও একজন উপেন্দ্র মাস্টারের ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়। নব্বই দশকের শেষ সময়। বাবু মহেন্দ্র মাস্টারের কনিষ্ঠ পুত্র বাবু মহিতোষ দাশ পরধামে গমন করেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে বাবু উপেন্দ্র মাস্টার। তখন শিক্ষাবোর্ড ছিল কুমিল্লায়। প্রত‍্যন্ত অঞ্চল হতে যোগাযোগ করা ছিল কষ্টসাধ্য। বাবু মহিতোষ দাশের আকস্মিক মৃত‍্যুতে স্কুলের ম‍্যানেজিং কমিটিতে চলে আসে কালো থাবা।
পরিবারটিতে চলছিল গভীর শোকের মাতম। দুধের ৩টি শিশু নিয়ে মহিতোষ বাবুর পত্নী ছিলেন দিশেহারা। যে ভদ্রমহিলার ঘরের বাইরে রাখতে হয়নি পা; সেই সময় মাসুম বাচ্চাদের নিয়ে সহ‍্যকরতে হয়েছে স্কুল পরিচালনা নিয়ে দুর্বিষহ ঝামেলা। যে পরিবারের দ্বারা এলাকায় বিদ‍্যার আলো জ্বলে ওঠলো, কৌশলে তাদের স্কুল ফাউন্ডার সদস‍্যপদটি বাতিল করে দিতে একটি অশুভ চক্র জেগে ওঠলো।
আর তখনই তাদের বিরুদ্ধে খর্গ স্বরূপ জুতা-হাতে উদয় হন বাবু উপেন্দ্র মাস্টার। সেটি বাবু মহেন্দ্র মাস্টারের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হোক আর শিক্ষক হিসেবে নৈতিকতার জায়গা থেকে হোক, বাবু উপেন্দ্র মাস্টার করেছেন; করতে পেরেছেন; যা এলাকায় এখনো কথিত।

১৯৯৬ সাল। এসএসসি ফলাফল নেমে আসে শূন‍্যর কোটায়। একজন ছাত্রও পাশ করতে পারেনি সেবছর। শিক্ষা বোর্ড হতে আসে কড়া বার্তা। সেদিন এমন ফলাফলে লজ্জা-ক্রোধে স‍্যার অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। বার বার ছাত্র-শিক্ষক সমেত সকলকে প্রলাপের মতো করে বলছিলেন আমার শিক্ষকতা জীবনে এমন ফলাফল খুব ব‍্যথিত হলাম; এও চাকুরি জীবনের শেষ সময়ে! অবশেষে ১৯৯৭ সালে স্কুলের রেজাল্ট আবার ঘুরে দাঁড়ায়; মনে পান প্রশান্তি। এমতাবস্থায় যারা স‍্যারের কাছে ছিল তারা বুঝতে পেরেছে একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের কতো কাছে ছিলেন উপেন্দ্র স‍্যার।

(৩)
যতদূর মনে পড়ছে, সাধারণত স‍্যারের মাথায় ছোট চুল,চোখে কালচে-লাল-খয়রি ফ্রেমের চশমা,পায়ে চামড়ার জুতো, কোন কোন সময় হাতে ঘড়ি লাগালেও স্কুলে আসতেন ধূতি-পাঞ্জাবি লাগিয়ে। আন্তর্জাতিক ইতিহাস পাঠে, মহাত্মা গান্ধির যেমন আইকনিক খাটো ধূতিপড়া ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তেমনি শিক্ষা বিতরণের ক্ষেত্রে আমাদের ছাত্রত্ব হতে শিক্ষকতার শেষদিন পর্যন্ত শ্বেত-শুভ্র পাঞ্জাবির পকেটে, ধূতির মুঠোগোজা ছাড়া এমন ছবি বা স্মৃতি চোখে ভাসে না এমন ছাত্র পাওয়া দুষ্কর হবে। মহাত্মা গান্ধি স্বদেশী আন্দোলন,ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিবাদ,দরিদ্রদের প্রতি একাত্মতা হতে ভারত স্বাধীনতার তরে এমন ভূষণ ধারণ করলেও আমাদের উপেন্দ্র স‍্যার বোধহয় শিক্ষার আদর্শিক দিক উজ্জ্বলতা, নির্মলতা, পবিত্রতা, সততা, সচ্ছতা, নিষ্কলুষতার প্রতীক শ্বেত বা সাদা শুভ্রতা পোশাক পরিধান করে পাঠদানে সূচিতাবোধ করতেন। আর সেই সূচিতাবোধ হতেই হয়তো শিক্ষক হিসেবে বাবু প্রহ্বলাদ দাশ (হবিবপুর নওয়াগাঁও), বাবু বিনোধ বিহারী দাশ (শাসখাই), বাবু শচীন্দ্র দাশ (হবিবপুর), বাবু মাখন লাল দাশ (হরিনগর), জনাব মোঃ আব্দুল কুদ্দুস (কাশিপুর), বাবু যোগন্নাথ চক্রবর্তী (সুখলাইন), বাবু হরিপদ দাশ (নিয়ামতপুর), বাবু তপন বরণ চৌধুরী (আদিত্যপুর), বাবু কাজল বরণ চৌধুরী (নাইন্দা), বাবু আনন্দ মোহন চৌধুরী (রঔয়া), বাবু পারিজাত তালুকদার চয়ন (মাখালকান্দি), জনাব শফিকুর স‍্যার, খন্ডকালীন শিক্ষক বাবু কানু সরকার (নাজিরপুর,খালিয়াজুড়ি) এমন একঝাঁক বিদগ্ধ নমস‍্য শিক্ষকদের পেয়েছিলাম। স্কুলের মাঠ ও বারান্দায় রাজনীতিক বাবু রামানন্দ চেয়ারম‍্যান (আঙ্গারুয়া,নওয়াগাঁও), বাবু উমেষ চক্রবর্তী (আনন্দপুর), বাবু প্রভাকর চৌধুরী (জয়পুর), রাজনীতিক জনাব অলিউল হক (কাশিপুর), বাবু জয়কুমার মাস্টার (ভোলানগর), বাবু বিশ্বাম্বর মেম্বার (আনন্দপুর), মাস্টার সুবোধ চক্রবর্তী (জয়পুর), মাস্টার অদৈত্য বাবু (আঙ্গারুয়া, নওয়াগাঁও), বাবু মহাপ্রভু মাস্টার (হরিনগর) এমন নমস‍্য ও গন‍্যমান‍্য ব‍্যক্তিবর্গের দ্বারা স্কুল মেনেজিং কমিটি ও বিচরন দেখতাম।

আজ স‍্যার নেই, প্রাকৃতিক নিয়মে চলে গিয়েছেন। উনার অবসরের পর হতেই শিক্ষকতার জায়গাটুকু কোন না কোন শিক্ষক দ্বারা পূর্ণ হয়ে চলছে। কিন্তু একজন উপেন্দ্র স‍্যারের উপস্থিতিতে স্কুলের যে ঝমকালো জৌলুস চোখে পড়তো এখন মনেহচ্ছে সেটা বিষন্ন ও বিবর্ণ।

বরং পরবাস হতে ভার্চুয়াল পাতা বা পত্রিকা পাতা খুললে স্কুলের দুর্দশাগ্রস্থতা দেখে একজন উপেন্দ্র মাস্টারের গঠিত স্বপ্নবাজকে নিস্তেজ করে তোলে। যে গিরিধরের ছাত্ররা রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায় হতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দাবিয়ে বেড়াচ্ছে সেখানে অন‍্যস্কুলের ছাত্র দিয়ে মেনেজিং কমিটির নমুনা, এতো বছরে কি গিরিধর এমন ছাত্র সৃজন করতে পারেনি প্রশ্ন তোলে। লজ্জায় মুখ ঢাকার উপায় করে তোলে। যে বিজ্ঞানভবনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে শাল্লা কলেজ, এসএসসি সেন্টারে বিজ্ঞান প্র্যটিকেল পরীক্ষা চলতো, সেই বিজ্ঞান ভবনের করুণদশা তথা দরজার জোড়াতালি ভঙ্গদশা দেখে নিজেকে অশ্রুসিক্ত করে তোলে। যে খেলার মাঠে ছাত্ররা খেলবে সেই খেলার মাঠকে বানিজ‍্যিক ধান্ধায় বরাদ্দ চলে। আর রেজাল্ট, অন‍্যান‍্য শুদ্ধিচারিতা, উপেন্দ্র স‍্যারের মতো সূচিতাবোধের দিকে না হয় আর আগালাম না।

স্কুলের ইতিহাস ঘাটালে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধান শিক্ষক ছিলেন উপেন্দ্র স‍্যার। বাবু মহেন্দ্র মাস্টার নিজে একজন শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার জন‍্যই হয়তো এক শিক্ষক আরের শিক্ষকের চিন্তা মগজে খুব কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন। আর দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ পেয়ে হাওর-আফাল-কান্দা বেষ্টিত নিভৃত অঞ্চলে এমন প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় শীর্ষে না নিতে পারলেও এলাকার পিছিয়ে পরা জনমানুষের শিক্ষার স্বপ্নকে শতভাগ জিয়িয়ে রেখে গিয়েছেন।

তাঁর কর্মযজ্ঞ, কর্মস্পৃহা, প্রজ্ঞা,স্নেহ, মমতায় আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার যে প্রদীপ প্রজন্মের হাতে তোলে দিয়েছেন তা শুধু স্বপ্নকে বুনবে না বরং জাগানিয়ার পথকে আরো সুগম করবে।

নমস‍্যে স‍্যার ; নমস‍্য আপনায়।

তথ‍্য সূত্র- (১) খোলা কলম, দৈনিক শ‍্যমাল সিলেট, ২৭মে ২০০৬ ।
(২) বইঃ মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী সংগ্রামী কমরেড শ্রীকান্ত দাশ পৃ-২২/২৩

সুশান্ত দাস প্রশান্ত: সেইন্ট ক‍্যালিক্সট, কানাডা

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.