Sylhet Today 24 PRINT

\'দাই দাই\' সময়ে দাউদাউ দ্য \'মিরাকল’!

উজ্জ্বল মেহেদী |  ২০ জুন, ২০২৬

বিশ্বকাপের তাপে-উত্তাপে শাকিরার গান ‘দাই দাই...’ করছে। আর এই ‘দাই দাই’ সময়েই দাউদাউ করছে নামকরণ-পরবর্তী মানহানি, তথা মানহরণ। আছে ‘মিরবাড়ি’। আছে ‘দিগন্ত’ ও ‘সীমান্ত’। কেন ‘মির দিগন্ত’ নয়, ‘মির সীমান্ত’ নয়—তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মিরবাড়ির মিঞা। ধীরস্থির সেই ব্যাখ্যার সারকথা—‘মিরাকল’! এ উক্তির মধ্যেও আছে মির—‘মিরাকল’। ফলে বীরদর্পে উচ্চারিত এ বয়ানও শেষ পর্যন্ত স্বগোত্রের গণ্ডিতেই আবর্তিত।

মিরবাড়ির মানহানিতে মামলা হয়েছে। মামলার আসামি সাংবাদিক, বাদীও সাংবাদিক। তাহলে মানটা গেল কার? সাংবাদিক বনাম সাংবাদিক! কথায় আছে, কাক কাকের মাংস খায় না। কিন্তু সাংবাদিক সাংবাদিকের মাংস শুধু খায়ই না, খেয়েদেয়ে ঢেকুরও তোলে।

কয়েক দিন আগে এক পডকাস্টে তৃণমূল সাংবাদিকতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। হিসাব কষে দেখলাম, এ পথে তিন দশক পার করে ফেলেছি। ‘আমার সাধ না মিটিল’ গানের সুর-সুবোধে বলেছিলাম, আরও তিনবার জন্ম নিলে তৃণমূল সাংবাদিকতাই করব। কথার কথা বলিনি। বলেছি, কারণ তেষ্টা এখনও মেটেনি; চেষ্টা এখনও বাকি।

সেই তেষ্টা-চেষ্টার টানে হবিগঞ্জের দিকে তাকাই। দেখি, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো সাংবাদিক দিয়ে সাংবাদিক পীড়নের এক বিশেষ কৌশল সেখানে বিগত জমানায় সগৌরবে চালু ছিল। নাম—‘হবিগঞ্জ স্টাইল’। কেন?

এই ‘কেন’-এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বড় বিবাদ। সেখানে রাজনীতি আর সাংবাদিকতার সুকীর্তি এমনভাবে মিশেছে যে তাদের আলাদা করা কঠিন। একসময় সাংবাদিকতা রাজনীতিকে চালাত, এখন রাজনীতি সাংবাদিকতাকে চালায়। কুকুর ও লেজতত্ত্বের মতো এক অদ্ভুত সম্পর্ক! চলতে চলতে রাজনৈতিক কর্মীও সাংবাদিক পরিচয়ে আবির্ভূত হন। কখনও সাংবাদিক সংগঠনের নেতাও হয়ে যান। শেষতক, প্রেসক্লাব প্যাঁচে পড়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়। এভাবেই গড়ে ওঠে সাংবাদিক নিপীড়নের ‘হবিগঞ্জ স্টাইল’।

বঙ্গীয় রাজনীতির ক্ষমতার দাপটে ‘স্টাইল অব দ্য ম্যান’-এর মতো সেই স্টাইলেরও একজন ‘ম্যান’ ছিলেন। তার কথায় তখন হবিগঞ্জ উঠত, বসত। সেই উঠ-বসের কালে তার ক্ষমতার উৎস সন্ধানে এক-দুইবার হবিগঞ্জ সরেজমিন ঘুরে এসে 'শতমুখ তবু একা' হয়ে বিফল হতে হয়েছিল।

বেচারা দম্ভের সুরে হতভম্ব করে জানিয়ে দিয়েছিলেন—তিনি সাংবাদিক, রাজনীতিক, আবার আইনজীবীও। তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে প্রমাণ দিতে হাজার কোটির ক্ষতিপূরণ মামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখতে হবে! অর্থাৎ, খবরেরও পর খবর আছে!

তার তল্লাটে আওয়ামী লীগ আমলের সর্বশেষ নির্বাচন, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারিতেও ‘ম্যান’-এর সুপারম্যানসুলভ ক্ষমতার প্রদর্শনী দেখা গেছে। নিজ দলের এক নিবেদিতপ্রাণ নারী সংসদ সদস্য সংরক্ষিত আসন ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁকে হারাতে যা যা করা অসম্ভব, তার সবই সম্ভব করা হয়েছিল। তবু শেষ পর্যন্ত হারতে হয়েছিল। ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনতা জনার্ধনে জিতেছিলেন সেই নারী সাংসদ।

দশক-দেড়েক সাংবাদিকদের ওপর দিয়ে কী গেছে, সে কাহিনি না-ই বা বললাম।
কারণ, স্টাইলের সেই ‘ম্যান’ এখন দেশে নেই। পলাতক। নামোল্লেখও করছি না। তবে যাঁদের তিনি পীড়নের পর পীড়নের মধ্যে রেখেছিলেন, তাঁদের সহনশীলতার ভেতর দিয়েই সাংবাদিকতা এখনও হবিগঞ্জে টিকে আছে।

দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা বেড়েছে না কমেছে, তার হালনাগাদ হিসাব নেই। তবে ১৪-১৫টি হবে। একটি জেলা থেকে এতগুলো দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা বিরল। এর মধ্যে দুই-চার-পাঁচটি অগ্রগামী—অর্থাৎ ক্ষমতাবান। আবার সাবেক ক্ষমতাবানদের পত্রিকাও তক্কে তক্কে আছে। ‘জ’-এর স্থলে এখন ‘গ’। খেলা আবার জমবে কি না, জানি না। তবে ‘হবিগঞ্জ ফলো’ বিষয়টি যে এখনও রয়ে গেছে, তা মনে হয়। ফলোআপ—বগুড়া।

জাতীয় সংসদে মির সাহেবের বক্তব্য শুনেছি। ‘মিরাকল’ নিয়ে যা বললেন, তাতে তিনি বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে হয়নি। বরং সেখানে ছিল এক ধরনের সতর্কবার্তা—সীমান্ত-দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত এক ভয়।

এই ভয় বড় হলে নির্বিবাদী কবি ইকবাল কাগজীর ভয়বাদী কবিতা ভর করে। ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মাঝে পড়ে জীবনে প্রথম অস্ত্র-সশস্ত্র বাস্তবতা দেখেছিলেন কবি। তখন লিখেছিলেন—
‘ভয়ে তড়পাচ্ছি!
কাকে?
বলবো না!
বললে—
তড়পানোর সময়ও পাবো না!’

কবির কবিতার সেই ‘তড়পানোর সময়’ কি আবার ফিরছে? যদি ফিরেও আসে, তাহলে থাক। শুরুতে যে গানটির কথা বলছিলাম, তা দিয়েই বরং এই লেখা শেষ করা যাক।

বলি, শাকিরার বিশ্বকাপ সংগীতে ‘Dai Dai’ ইতালীয় ভাষার একটি প্রচলিত অভিব্যক্তি। অর্থ—‘চলো’, ‘এগিয়ে যাও’, ‘লেগে থাকো’। গানটির কোরাসে ইতালীয়, জাপানি, স্প্যানিশ, ফরাসি ও ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষার একই ধরনের উৎসাহব্যঞ্জক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

গানের মূল বার্তা একটাই—চলো, এগিয়ে যাও, স্বপ্নের পথে লড়াই করো। এই বার্তার মাঝেই বগুড়ার বার্তাও বইছে। নাম পরিবর্তন করতে বলা হয়েছে। মির সাহেবও কিছুটা নির্জীব। বিবৃতি দিয়ে আর কোনো নয়া নামকরণ করতে না করেছেন। মামলা ও সাংবাদিক গ্রেপ্তারে নমনীয়।

তবু বিগত দেড় দশক পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছে, সাংবাদিক দিয়ে সাংবাদিক পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ‘হবিগঞ্জ স্টাইল’ এখনও পুরোপুরি ইতিহাস হয়নি। যদিও সেই জমানার ‘আ’ আদ্যাক্ষরের ‘জ’ নামের ক্ষমতাবান ব্যক্তিটির ক্ষমতা ফুরিয়ে—ফতুর!


উজ্জ্বল মেহেদী : লেখক ও সাংবাদিক।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.