Sylhet Today 24 PRINT

হিমালয়ের বরফ গলে গেলে দায় কার?

রাজীব চৌধুরী |  ২৭ আগস্ট, ২০২৬

কখন কোন ঋতু আসে, কখন বৃষ্টি হবে, কখন গরম কিছুটা কমবে—একসময় এসবের একটা স্বাভাবিক ছন্দ ছিল। এখন সেই ছন্দ যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। গরমের তীব্রতা বাড়ছে, বৃষ্টির সময় ও ধরন বদলাচ্ছে; কখনো দীর্ঘ বৃষ্টি, কখনো অস্বাভাবিক শুষ্কতা। প্রকৃতির এই পরিবর্তন এখন আর শুধু আবহাওয়ার খবর নয়, আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ।

পরিবেশকর্মী হিসেবে জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জলবায়ু সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে—পৃথিবী সমস্যাটি সম্পর্কে যথেষ্ট জানে, সমাধানের কথাও জানে; কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে এখনও বড় একটি দূরত্ব রয়ে গেছে।

একদিকে সম্মেলনের বিশাল মঞ্চে কার্বন নিঃসরণ, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আলোচনা হয়; অন্যদিকে পৃথিবীর কোথাও কোনো কৃষক অনিশ্চিত বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকেন, কোনো উপকূলীয় পরিবার ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় রাত কাটায়, আবার কোনো পাহাড়ি জনপদ জানে না পরবর্তী বর্ষায় তার চারপাশ কতটা নিরাপদ থাকবে।

এই দূরত্বই জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। বুধবার ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রসুয়া অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর আমাকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করছি। নিখোঁজ মানুষদের স্বজনদের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা এবং যারা এখনো উদ্ধার ও অনুসন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছেন, তাদের জন্য গভীর উদ্বেগ ও সহমর্মিতা।

দুর্যোগটি শুধু নেপালের রসুয়া অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর অভিঘাত চীনের তিব্বতের গিরং এলাকাতেও পড়েছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে নেপালে মৃতের সংখ্যা ১৫৭ ( আরও বাড়তে পারে) এবং চীনের তিব্বত অংশে আরও তিনজনের মৃত্যুর কথা এসেছে। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ, তাঁদের মধ্যে স্থানীয় মানুষ, পর্যটক ও বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।

ভয়াবহতার আরেকটি দিক হলো, এটি ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির একটি দুর্যোগ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদীর পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত জনপদ, সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি এবং জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর আঘাত হানে। উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া, কাদা-পলি জমে যাওয়া এবং নদীর পানি অস্থির থাকার কারণে।

তখন প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। হিমালয়ের বরফ গলে গেলে তার দায় কি শুধু পাহাড়ের মানুষের?

প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক ও স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, লেন্দে খোলা অঞ্চলে বরফ ও পাথরের একটি বিশাল ধস নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দেয়। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে জমে থাকা পানি ও বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও পলি একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প এই ধসের সূচনায় ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

এখানে একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কতা জরুরি। এই নির্দিষ্ট বন্যাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা এখনো ঠিক হবে না। কারণ দুর্যোগটির তাৎক্ষণিক কারণ ও ট্রিগার নিয়ে তদন্ত চলছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে হিমালয়ের হিমবাহ ও বরফের পরিবেশ বদলে যাচ্ছে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে বরফধস, হিমবাহ-সম্পর্কিত বন্যা ও অন্যান্য আকস্মিক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীরা ক্রমেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

অর্থাৎ, একটি দুর্যোগের কারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এক নয়; কিন্তু পরিবর্তিত জলবায়ুর পৃথিবীতে এ ধরনের ঝুঁকিকে নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা অনেক সময় মেরু অঞ্চলের বরফ, দূরবর্তী দ্বীপ বা ভবিষ্যতে ডুবে যেতে পারে এমন শহরের গল্প হিসেবে দেখি। বাস্তবে এর প্রভাব আমাদের জীবনেও স্পষ্ট হচ্ছে। কৃষকের ফসলের হিসাব, বৃষ্টির ধরন, তাপপ্রবাহের তীব্রতা—সবকিছুতেই পরিবর্তনের চাপ অনুভূত হচ্ছে।

প্রতিটি অস্বাভাবিক বৃষ্টি বা প্রতিটি বন্যাকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের প্রবণতা যখন স্পষ্ট, তখন বিচ্ছিন্ন ঘটনার বদলে সামগ্রিক পরিবর্তনের দিকে তাকানো জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয় আমাদের থেকে দূরে, কিন্তু তার নদীগুলো আমাদের জীবন থেকে দূরে নয়। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং কৃষি, মৎস্য, জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

অন্যদিকে বাংলাদেশ নিজেই একটি নিম্নভূমির বদ্বীপ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বন্যা ও লবণাক্ততার মতো ঝুঁকি আমাদের সামনে ইতোমধ্যেই রয়েছে। উজানে পানি প্রবাহের পরিবর্তন আর ভাটিতে সমুদ্রের চাপ—দুই দিকের পরিবর্তনই তাই আমাদের ভাবতে হবে।

এই কারণেই জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি পানি, খাদ্য, কৃষি, অর্থনীতি এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন।

প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তবায়ন :

জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন—আমরা কতগুলো ঘোষণা দিলাম, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ঘোষণাগুলো মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাল।

২০২৪ সালের কপ ২৯-এ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি সব উৎস মিলিয়ে বছরে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সংখ্যাগুলো বড়। কিন্তু একজন উপকূলীয় কৃষকের কাছে এই অর্থের মূল্য তখনই, যখন তা লবণাক্ততা সহনশীল ফসল, নিরাপদ পানি, বাঁধ কিংবা দুর্যোগের পর পুনর্বাসনের বাস্তব সহায়তায় পরিণত হয়।

২০২৫ সালের কপ ৩০ এ বেলেম প্যাকেজে অভিযোজন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর আরও জোর দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থের প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব অর্থপ্রবাহ এবং মাঠপর্যায়ের প্রকল্পে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এখানেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি সামনে আসে। যারা ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে, তাদের দায়িত্বও বেশি। সবচেয়ে কম অবদান রাখা দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যেন সবচেয়ে বেশি মূল্য না দেয়—এটাই হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতির অন্যতম মূলনীতি।

সমাধান তাই দুই দিকেই।
একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে এবং কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে। অন্যদিকে ইতোমধ্যে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

হিমালয় অঞ্চলে স্যাটেলাইট, সেন্সর ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে হিমবাহ, বরফধস ও হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ জরুরি। পাহাড়ি আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে Early Warning System জীবন বাঁচাতে পারে। কয়েক মিনিটের সতর্কবার্তাও কখনো একটি পুরো জনপদকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন উপকূলীয় বাঁধ ও ম্যানগ্রোভ বন রক্ষা, নদী ও জলাধার সংরক্ষণ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ। পাশাপাশি নেপাল, ভারত, ভুটান, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্যার পূর্বাভাস, নদীর প্রবাহ, হিমবাহ ও জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় আরও কার্যকর করা দরকার।

কিন্তু শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা সরকারি পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। আমাদের উন্নয়ন ভাবনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। নদী দখল করে, জলাভূমি ভরাট করে, পাহাড় কেটে কিংবা বন ধ্বংস করে যে উন্নয়ন হয়, তা শেষ পর্যন্ত দুর্যোগের ঝুঁকিই বাড়ায়।

প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা নয়, প্রকৃতিকে বুঝে উন্নয়ন করাই এখন সময়ের দাবি।
নেপালের এই মর্মান্তিক বিপর্যয় আমাদের সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিল। হিমালয়ের কোনো দুর্গম উপত্যকায় বরফ ও পাথরের ধস নামলে তার অভিঘাত পাহাড়ে আটকে থাকে না। নদী তাকে বহন করে নিয়ে যায় বহু দূরে। প্রকৃতির কোনো সীমান্তরেখা নেই।

আজ হিমালয়ের বরফ ও পাহাড়ের পরিবেশ বদলাচ্ছে। আগামীকাল নদীর আচরণ বদলাতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে আমাদের নদী, উপকূল ও মানুষের জীবনে।


লেখক : প্রকাশক, পরিবেশকর্মী।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.