মোহাম্মদ মহসীন, পিআইডি ফিচার | ৩০ আগস্ট, ২০২৬
যখন তখন সড়কে দুর্ঘটনা, রক্তাক্ত রাজপথ। প্রতিদিনই সড়কে আমরা অকালমৃত্যুর হৃদয়বিদারক সংবাদ পড়ি। সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু ঘটনায় অনেক মানুষ অকালে মারা গেছেন। বিভিন্ন খবরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় অতি সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে ২ জন পথচারী, লালমনিরহাটে ট্রাক চাপায় ২ জন অটোরিকশার যাত্রী, গাজীপুরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২জন, সীতাকুণ্ডে মোটর সাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়। বগুড়ায় দ্রুতগতির বাস চাপা দিলে ৭ জন শ্রমিক, প্রাইভেট কারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু হয়। এইরকম চিত্র প্রতিদিনকার। প্রতিদিনই সড়কে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, কেউ আবার পঙ্গুত্বের শিকারও হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রোড ক্র্যাশের ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে শুধু জলাই মাসে ৪১৬ জন মারা গেছে। আগস্ট মাসে এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। গত সপ্তাহে, ‘জামালপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় সিভিল জজ নিহত’ শিরোনামের সংবাদটি চোখে পড়ে। মাত্র ২৭ বছর বয়সী তরুণ বিচারক একেএম সামিউল হক মারা যান। ১ বছরও হয়নি তার চাকরির বয়স, ১৭তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে ডিসেম্বর ২০২৫-এ সহকারী জেলা জজ পদে যোগ দেন এ তরুণ। প্রতিনিয়ত এমন অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশের অগণিত পরিবার ও রাষ্ট্র।
আর এভাবেই প্রতিদিন বিআরটিএ-এর অনুমোদনহীন ফিটনেসবিহীন বাস আর বেপরোয়া চালকদের অবহেলায় ঝরে যাচ্ছে শত শত প্রাণ। ইদানীং বেশি বেশি দেখা যাচ্ছে সাধারণ এসি বাসের চেসিস ও বডিতে অবৈধভাবে দোতলা কেবিন বানিয়ে তৈরি করা হচ্ছে স্লিপার বাস। এসব স্লিপার বাসের ভারসাম্য ঠিক থাকে না। ফলে জরুরি মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। গত ৭ আগস্ট ওসমানীনগরে বেঙ্গল পরিবহনের একটি অবৈধ স্লিপার বাস ও ইউনিক পরিবহনের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৯ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১৫ হাজারেরও বেশি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ জন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আর অক্ষত অবস্থায় ফিরতে পারেননি। দুর্ঘটনা বাড়ায় সম্প্রতি সিলেটের কদমতলী ও হুমায়ুন রশীদ চত্বরে জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ যৌথ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও সতর্ক করেছে। বিআরটিএ জানিয়েছে, অনুমোদনহীন স্লিপার বাস চালানো বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে গাড়ি জব্দ ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়, কিন্তু বাংলাদেশে সড়কের এই মৃত্যুমিছিল একটি নিষ্ঠুর নিয়তি হয়েই থেকে যায়।
জনকল্যাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাংলাদেশের সড়কসমূহ এক অঘোষিত কসাইখানা। প্রতিদিন কোনো না কোনো সড়ক দুর্ঘটনার খবর শুনি। বাসচাপায় প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী, ট্রাকের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া প্রাইভেটকার, কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানো মোটরসাইকেলের আরোহী। এত দুর্ঘটনাতেও তবু আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। দুর্ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ইন্নালিল্লাহি’ পোস্ট, পোস্টে স্যাড রিয়্যাক্ট, দুইদিনের আলোচনা বা শোকসভা। তারপর আবার স্বাভাবিক জীবন। অথচ প্রতিটি মৃত্যু একেকটি পরিবারকে আজীবনের কান্না উপহার দিয়ে যায়।
আমাদের সড়ক পথ যেন আজ এক উত্তাল ভয়াল খেলার মাঠ, যেখানে প্রতিদিন জীবন বাজি রাখা হয়। তবে অন্ধকারে আলো দেখাচ্ছে কিছু উদ্যোগ। নতুন ট্রাফিক আইন, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, মিডিয়ার সরব ভূমিকা। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়, যদি না প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। চালক, যাত্রী, প্রশাসন, নীতিনির্ধারক-সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও পরিবহন খাত সুশৃঙ্খল রাখতে সরকারও বদ্ধপরিকর। সড়কে নিরাপত্তা ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনয়নে সরকার তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সেবাগুলোকে আরও সহজ, দ্রুত ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নিয়েছে। পেশাদার চালকদের প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিআরটিএ দেশের প্রতিটি জেলায় চালু করেছে বিশেষ প্রচারাভিযান। এর অংশ হিসেবে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বার্তা ছড়িয়ে দিতে লিফলেট, পোস্টার এবং স্টিকার বিতরণ করা হচ্ছে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালকদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যে বাস্তবায়নাধীন। বিআরটিএ-কে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক এবং জনসেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে বর্তমান সরকার নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন হলো প্রধান ও সর্বাধিক ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যম। আধুনিক, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের সড়ক নেটওয়ার্ক ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। এই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সঙ্গে বাড়ছে মোটরযানের সংখ্যা এবং তার ব্যবহারও। জনবল বৃদ্ধি, বিআরটিএ’র প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট অনলাইন সেবার পরিধি সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেবা সহজীকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সরকার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ‘সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২’ প্রণয়ন করেছে। মোট ১৬৭টি বিধি সমন্বিত এ বিধিমালা ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। বিধিমালার আওতায় ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে এককালীন অন্যূন ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) টাকা, অঙ্গহানির ক্ষেত্রে এককালীন অন্যূন ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা, চিকিৎসা সত্ত্বেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকলে এককালীন ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা, চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকলে এককালীন অন্যূন ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে।
সরকারের অনুমোদনক্রমে ট্রাস্টি বোর্ড আর্থিক সহায়তার এই পরিমাণ কমাতে বা বাড়াতে পারবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজে অথবা মৃত ব্যক্তির আইনানুগ উত্তরাধিকারী দুর্ঘটনার তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে হবে। আবেদন ফরম ও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ওয়েবসাইটে।
হরহামেশা ঘটে যাওয়া এসব সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ প্রদানের লক্ষ্যে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর ৫৩ ধারায় আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এ তহবিলের জন্য প্রতিটি মোটরযান মালিককে বাধ্যতামূলকভাবে বার্ষিক বা এককালীন চাঁদা প্রদান করতে হবে। ১২-সদস্যবিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ড (বিআরটিএ চেয়ারম্যান, পরিবহন মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট নাগরিকসহ) এ তহবিল পরিচালনা করবে। দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করলে, তদন্ত সাপেক্ষে ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। এছাড়া, বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সাজা নির্ধারিত রয়েছে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পাসকৃত সড়ক পরিবহন আইনে।
এ ছাড়াও সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এ বলা হয়েছে, চালক নিয়োগে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, গণপরিবহনে পিটিএ অনুমতিপত্র, এবং কন্ডাক্টর/সুপারভাইজারের ক্ষেত্রে লাইসেন্স ও ডোপটেস্ট সনদ বাধ্যতামূলক। এদের শ্রম আইন অনুযায়ী বেতন ও সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা দরকার, সড়ক নিরাপত্তায় প্রয়োজন গাড়ির গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত সিটবেল্ট ও হেলমেট ব্যবহার, দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। তবে আমি বা আপনি যতই সচেতন যাত্রী বা চালক হই না কেন, অন্যের ভুলে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকলকে একযোগে আইন মেনে চলা, ভালো চালক, যাত্রী ও পথচারী হওয়া জরুরি। কারণ সড়ক দুর্ঘটনা কমলে শুধু প্রাণই বাঁচবে না, দেশের অর্থনীতিও হবে আরও শক্তিশালী। তাই ভ্রমণ হোক নিরাপদ ও আনন্দময়, বন্ধ হোক সড়কে অকালমৃত্যু।