Sylhet Today 24 PRINT

গণমাধ্যমকে সীমাবদ্ধ করবে খসড়া সাইবার আইন, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো আশঙ্কাজনক

মাহফুজ আনাম |  ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রথমেই যে বিষয়ে জনগণ এবং বিশেষ করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই তা হলো, সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী লিখেছেন আমলারা। অন্য অনেক ক্ষেত্রে এটি বোধগম্য হলেও মানুষের চিন্তা, বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আইন তৈরির ক্ষেত্রে তাদের ওপর ভরসা করার তেমন কোনো কারণই নেই। আমলাতন্ত্র স্বভাবগতভাবেই প্রশ্ন, ভিন্নমত, বিরোধিতা কিংবা সমালোচনা অপছন্দ করে। তাদের প্রধান আগ্রহ ‘আনুগত্যে’। তাদের ‘কর্তারা’ যা চান, সেটাই তারা ‘নিরাপত্তার’ নামে নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকেন।

এর প্রমাণ সম্ভবত এটাই যে, ডিজিটাল বা সাইবার আইনের নামের মধ্যে দীর্ঘদিন ‘সুরক্ষা’র পরিবর্তে ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি ছিল। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেকের কাছে ‘সুরক্ষা’ বলতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বোঝায়। অন্যদিকে ‘নিরাপত্তা’ এমন একটা সরকারের ইঙ্গিত দেয়, যেটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে জনগণের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতিক, দলের সদস্য, আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেয়।

বর্তমান আইনের খসড়া প্রণেতা ও এর সমর্থকরা যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বিবেচনায় নেননি তা হলো, একসময় আলাদা থাকা ‘সাইবার জগৎ’ ও ‘গণমাধ্যমের জগৎ’ এখন এমনভাবে একীভূত, পরস্পরনির্ভরশীল ও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত যে, সাইবার জগতের জন্য প্রণীত যেকোনো আইন স্বয়ংক্রিয় ও অনিবার্যভাবেই গণমাধ্যমেও প্রভাব ফেলবে। আর সেই প্রভাব অবধারিতভাবেই নেতিবাচক হবে।

অপরাধ দমন এবং স্বাধীনতা সম্প্রসারণের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের জন্য সেই পুরোনো ছাঁচে একটি আইন করা যায় না। একটি আইন দিয়ে এই দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা আদৌ সম্ভব কি না, শুরুতেই সেই প্রশ্ন গুরুত্বের সঙ্গে তোলা উচিত।

২০১৮ সালে তৎকালীন আইসিটি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সময়ে প্রণীত হয় কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)। ২০২৩ সালে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সময়ে ডিএসএর পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) করা হয়। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সময়ে সিএসএর পরিবর্তে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যা ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার আইনে পরিণত করে। গত জুনে ওই আইনের একটি সংশোধনী পাস হয় সংসদে। এখন আবার আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে। তবে, দুঃখজনকভাবে এবারের সংশোধনী আইনটিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, অখণ্ডতা, জনশৃঙ্খলা, উসকানি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তিতে অনলাইন কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বিদ্যমান সাইবার আইনেই রয়েছে। কিন্তু নতুন খসড়ার ৮(২) ধারায় শুধু তথ্যের ভিত্তিতে নয়, আশঙ্কার ভিত্তিতেও কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে। এতে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য ‘মানহানিকর’ বা ‘অবমাননাকর’ তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

যদি আশঙ্কার ভিত্তিতে কোনো আইন প্রয়োগ করা যায় এবং সেটি যদি মানহানির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে স্পষ্টতই এর প্রয়োগ বিষয়ভিত্তিক ও ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। আমাদের আইন প্রয়োগকারীরা রাজনৈতিক হাওয়ার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান বদলান এবং অর্থের ক্ষমতার প্রতি অত্যন্ত ‘শ্রদ্ধাশীল’। তাদের সেই অতীত রেকর্ড বিবেচনায় আমরা অনুমান করতে পারি, প্রস্তাবিত সাইবার আইনও সম্ভবত আগের আইনগুলোর মতো একই পথে যাবে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, খসড়ায় এমন কিছু নতুন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আইনটি প্রয়োগের ক্ষমতা দিচ্ছে, যেগুলো আগে কখনো এর আওতায় ছিল না। এর মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ও রয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে এই আইন ব্যবহার করতে পারেন। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরকে ঘিরে বিতর্কের কথা সবারই জানা। অথচ, একের পর এক সরকার ক্ষমতায় এলেও এ বিষয়ে কিছুই করা হয়নি।

বর্তমান আইনের ২৫ ধারায় রয়েছে মূলত অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পর্নোগ্রাফি এবং শিশু যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত উপাদান। আমরা এটিকে প্রাসঙ্গিক মনে করি। কিন্তু সংশোধনীতে এই ধারাটিকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে মানহানি, অপমান, হেয় প্রতিপন্ন করা ও বুলিংকেও এর আওতায় এনেছে। কাউকে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করতে পারে, এমন বক্তব্য, প্রকাশনা ও প্রতিবেদনকেও এর আওতায় আনা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি সরকারি তহবিল চুরি করলে; খাদ্য বা ওষুধে ভেজাল দিলে; নিম্নমানের রাস্তা, সেতু বা রেলপথ নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করলে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি ঋণ দিলে তার সুনাম ক্ষুণ্নকারী তথ্য প্রকাশ না করে কীভাবে সে বিষয়ে প্রতিবেদন লেখা সম্ভব?

এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। কেননা, যেকোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং করবেও। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কারা এবং তারা কোন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেটা প্রকাশ না করে গণমাধ্যম কীভাবে কোনো দুর্নীতির ঘটনা সামনে আনবে? দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কী হবে? কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে, এটা জানতে পারলে তারা কি কোনো সাংবাদিককে কাজটি করতে দেবে?

এই খসড়া আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। কারণ, যে কেউ দাবি করতে পারেন, তার ‘মানহানি’ করা হয়েছে। আর পুলিশ ও অন্যরা কোনো সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা অনলাইন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে ঢুকে কনটেন্ট জব্দ করতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা নথি নিয়ে যেতে পারে, যা পুরো প্রকাশনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

২৫ ধারায় আগের চেয়েও অনেক কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়েছে। সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে দুই বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। ভুক্তভোগী কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী হলে শাস্তি ১০ বছর এবং জরিমানার পরিমাণও অনেক বেশি। বক্তব্য বা সংবাদ প্রতিবেদন-সংক্রান্ত যে বিষয়গুলোকে অপরাধ বলা হচ্ছে, সেগুলো সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ভয় তৈরি করবে। ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়বে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে যাবে।

কাজেই এখানে বৈধ ও অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—এসব সংশোধনী কি দুর্নীতি কমানোর জন্য, নাকি দুর্নীতিবাজদের রক্ষার জন্য?

প্রস্তাবিত ২৬(এ) ধারার সমতুল্য কোনো বিধান বর্তমান আইনে নেই। এখানে সাইবার স্পেসে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং এর সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড। এটি বিপজ্জনক। কারণ, ‘গুজব’ বা ‘ভুল তথ্য’ বলতে কী বোঝায়, তার কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ছাড়া কোনো অপরাধ যথাযথভাবে নির্ধারণ করে ‘লঙ্ঘনকারীকে’ শাস্তি দেওয়া সম্ভব নয়। এর ফলে আইনের অপব্যবহারের পথ তৈরি হয়।

প্রস্তাবিত আইনটি সাংবাদিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, এর ২৫ ও ২৬ ধারার বিধানগুলো ব্যাপক পরিসর দিয়ে লেখা হয়েছে। ‘গুজব’, ‘বুলিং’, ‘ভুল তথ্য’, ‘ডিজিটাল মানহানি’, ‘অপমান’ ও ‘ভুয়া খবর’—এর কোনোটিরই সুস্পষ্ট সংজ্ঞা খসড়ায় নেই। বিশেষ করে গুজব বলতে কী বোঝায়, সেটা স্পষ্ট না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের। এর মধ্যে এমন অসমর্থিত বা যাচাই না করা তথ্য, সংবাদ বা দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তি, ভয় বা সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বা ‘তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে’।

এসব শব্দের অর্থ অস্পষ্ট। এগুলোর ব্যাখ্যা এতটাই বিষয়ভিত্তিক হতে পারে যে, আইনটির এ ধরনের বিধান পুলিশ ও অন্য কোনো সরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হলে তা ভয়-ভীতি সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করবে, ঘুষের সম্ভাবনার কথা তো বাদই দিলাম।

আইনের তদন্তসংক্রান্ত ক্ষমতাও উদ্বেগের কারণ। ৩৩ ও ৩৪ ধারায় কর্তৃপক্ষকে কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সংরক্ষিত ডেটায় প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিকদের গবেষণা ও বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন হয়। এসব সূত্রের অনেকেই পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেন। কোনো তদন্ত কর্মকর্তা একজন সাংবাদিকের ফোন, কম্পিউটার ও নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখলে এ ধরনের সূত্র আর কথা বলবে? স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের সূত্র ভীত হয়ে পড়বে, যার ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

নতুন খসড়ায় প্রস্তাবিত সবচেয়ে বিস্ময়কর ও লজ্জাজনক সংশোধনী হলো ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার, যা সবচেয়ে কুখ্যাত ডিএসএ-সহ আগের কোনো আইনেই ছিল না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা, যারা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের (ডিএম) অধীনে থাকেন। ডিসিরা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার মানে প্রশাসকদের মাধ্যমে বিচার, অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সরকারের মাধ্যমে বিচার। কোনো ভ্রাম্যমাণ আদালত কি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অনুমতি দেবে, বিশেষ করে যদি সেই প্রতিবেদন সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতি তুলে ধরে? কোনো মন্ত্রী তার ইচ্ছামতো কাজ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে বাধ্য করতে পারেন। কারণ কোনো মন্ত্রীর সিদ্ধান্তে ডিসির হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কম।

আগের সব আইনেই সাইবার অপরাধের বিচার হতো ট্রাইব্যুনালে, যার নেতৃত্বে থাকতেন একজন বিচারক। প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অনুমোদন পেলে এই প্রথম কোনো ভ্রাম্যমাণ আদালত ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। নিত্যপণ্যের দাম কারসাজি নিয়ে অনুসন্ধানরত কোনো প্রতিবেদককে রাস্তায় আটকে গুজব ছড়ানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করতে পারবে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং কারাদণ্ডও দিতে পারবে। হ্যাঁ, হতে পারে যে তেমন কিছু হবে না। কিন্তু এমন সম্ভাবনা যেহেতু আছে, একজন সম্পাদক হিসেবে আমি কি আমার সহকর্মীর মৌলিক স্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় এমন ঝুঁকি নিতে পারি?

সবমিলিয়ে আমাদের উপসংহার হলো, খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইনে গণমাধ্যমকে সুরক্ষিত রাখার কোনো উপায় নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে সাইবার আইন প্রয়োগের সময় বিচারিক তদারকির বিধান ছিল। বিস্ময়করভাবে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে। কেন? সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই বিধান প্রত্যাহারের ফলে আইনটির নির্মম প্রয়োগ ও প্রকাশ্য অপব্যবহারের পথ খুলে দিতে পারে।

এই সরকার কি অতীত থেকে কিছুই শিখবে না? ডিএসএর কারণেই ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনা এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে তীব্র ও অসম্মানজনক মনোভাব তৈরি হয়েছিল। এই খসড়া সংশোধনীর প্রবক্তারা কি একবারও প্রশ্ন করবেন না—ডিএসএর অধীনে কতজন সাইবার অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল বা আইনের আওতায় আনা হয়েছিল, আর কতজন সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, লেখক, কবি ও সমালোচককে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল? মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করে ফেসবুক পোস্টের কারণে মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ডিএসএতে শাস্তির বিধান থাকা ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টিই ছিল জামিন অযোগ্য। খসড়া আইনেও জামিন অযোগ্য ধারা রয়েছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। মানুষকে গ্রেপ্তার করে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর জামিন দেওয়া হয় না। জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় সাংবাদিকরা দুর্নীতির ঘটনা উন্মোচনে খুব কমই সাহস করবেন।

আমরা আগেই বলেছি, খসড়া আইনটি সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্য করে প্রণীত হলেও শেষ পর্যন্ত এর লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীরা। ইন্টারনেট, ডিজিটালাইজেশন এবং এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গণমাধ্যমকে আরও গভীরভাবে সাইবার জগতের দিকে নিয়ে যাবে। বাস্তবতা হলো, মুদ্রিত গণমাধ্যমের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে এবং গণমাধ্যম কেবল ডিজিটাল জগতেই টিকে থাকবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে গণমাধ্যম-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলোকে ডিজিটাল জগতের উপযোগী করে তুলতে হবে। সেই বাস্তবতার আলোকে আমাদের সব গণমাধ্যম আইন নতুন করে লিখতে হবে।

গণমাধ্যমের জন্য আমাদের একটি পৃথক সাইবার আইন প্রয়োজন। কিংবা, অন্তত এমন একটি পৃথক বিধিমালা ও নির্দেশিকা প্রয়োজন, যা বাক, মতপ্রকাশ ও প্রকাশনার স্বাধীনতা ব্যাহত না করে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ করবে। বিশ্বে এখনো এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়েছে, তবে খুব বেশি নয়। সম্ভবত বাংলাদেশই পথপ্রদর্শক হতে পারে।

খসড়া সাইবার আইন সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র, জবাবদিহিমূলক সরকার ও স্বচ্ছ প্রশাসনের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই আইন বিএনপি সরকারের জন্য ক্ষতিকর হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি তার সমর্থনের বিষয়ে শুরুতেই অত্যন্ত ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাই আমরা ধরে নিতে চাই, বর্তমান খসড়ার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে তাকে পুরোপুরি অবহিত করা হয়নি।

প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো নতুন করে পর্যালোচনা ও পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। আমরা প্রস্তাব করছি, দুটি বিশেষজ্ঞ দলের সমন্বয়ে একটি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হোক। একটি দল সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করবে এবং অপরটি গণমাধ্যম, এর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কাজ করবে। উভয় দলই তাদের নিজ নিজ পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাইবার জগতের বিপদগুলো তুলে ধরতে পারে। আমরা সাংবাদিকরা সেখানে পূর্ণ সহযোগিতার অঙ্গীকার করছি। এক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করেছে এমন দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘকেও আমরা সম্পৃক্ত করতে পারি এবং ডিজিটাল জগতের নতুন গণমাধ্যমের জন্য একটি উপযুক্ত আইন প্রণয়নে সত্যিকার অর্থেই নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে পারি।

  • মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার
  • লেখাটি দ্য ডেইলি স্টার থেকে সংগৃহীত।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.