মেহজাবিন মাশরাহ | ১১ অক্টোবর, ২০২৬
শিশুদের হাতেই গড়ে উঠবে আগামী দিনের পৃথিবী। তাদের চিন্তা, মূল্যবোধ, সিদ্ধান্ত ও আচরণেই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ সমাজের চেহারা। অথচ সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব যাদের হাতে তারাই অনেক সময় জেনে বা না জেনে এমন আচরণ করেন যার ক্ষত একটি শিশুকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হতে পারে। একটি শিশুর বেড়ে ওঠা শুধু তার শারীরিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এর সঙ্গে জড়িত তার দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা।
পরিবারকে শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলা হয়। তাই পরিবারের একটি কথা, একটি আচরণ, একটি অবহেলা কিংবা ভুলভাবে সন্তানকে বড় করার অভ্যাস কখনো কখনো শিশুর মনে এমন গভীর ছাপ ফেলে, যা বহু বছর পরেও মোছা যায় না। সব ক্ষত শরীরে দেখা যায় না। কিছু ক্ষত তৈরি হয় এমন কথায়, যা বলার পর বড়রা ভুলে যান, অথচ শিশুটি ভুলতে পারে না। কিছু ক্ষত তৈরি হয় এমন নীরবতায়, যেখানে শিশুটি সাহায্য চেয়েও সাড়া পায় না।
আমেরিকান সাংবিধানিক আইনজীবী, লেখক এবং নাগরিক অধিকার বিশেষজ্ঞ জন ডব্লিউ হোয়াইটহেড বলেছিলেন, “Children are the living messages we send to a time we will not see.” - (John W. Whitehead) অর্থাৎ “শিশুরাই সেই জীবন্ত বার্তা, যা আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে পাঠাই, যে ভবিষ্যৎ হয়তো আমরা নিজেরা দেখতে পাব না।” বিখ্যাত এই মানুষের উক্তিটি তাৎপর্যপূর্ণ হলেও আমাদের দেশে আমাদের সমাজে শিশুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হচ্ছে।
আমার দেখা কতক শিশুর গল্পের মাধ্যমে সেই অদৃশ্য সমস্যাগুলো দেখাবো। সংগত কারণেই গল্পগুলো ছদ্মনামে উপস্থাপন করছি। এবং উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট পরিবারকে অভিযুক্ত করা নয়, বরং আমাদের চারপাশের পরিচিত আচরণগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
বডিশেইমিং: শিশুর শরীর আপনার বিনোদনের বিষয় নয়
ছোটবেলা থেকেই পাপড়ি তার রোগা শরীর নিয়ে নানা মন্তব্য শুনে বড় হয়েছে। কখনো পরিবারের কেউ মজা করে বলেছে, “তুই এত চিকন কেন?” কখনো আত্মীয়স্বজনের সামনে তার শরীর নিয়ে হাসাহাসি হয়েছে। বড়দের কাছে এগুলো হয়তো নিছক ঠাট্টা, কিন্তু পাপড়ির কাছে প্রতিটি মন্তব্য ধীরে ধীরে নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজের শরীরকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শিখেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পোশাক বেছে নেওয়ার সময় তার মনে হয় “এটা পরলে সবাই আমার শরীর নিয়ে আবার কথা বলবে না তো?” বাইরে যাওয়ার আগে বারবার পোশাক বদলানো, মানুষের সামনে অস্বস্তি বোধ করা এবং নিজের চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যে পোশাক তার নিজের পছন্দ, সেটিও পরতে সে দ্বিধা করে। কারণ নিজের পছন্দের চেয়ে অন্যরা তাকে কীভাবে দেখবে, সেটিই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাপড়ি বড় হয়েছে, কিন্তু ছোটবেলায় শোনা কথাগুলো তার সঙ্গে এখনো জড়িয়ে আছে। অন্যদের কাছে যা ছিল কয়েক সেকেন্ডের হাসি, পাপড়ির কাছে তা হয়ে উঠেছে নিজের শরীরকে গ্রহণ করতে না পারার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। পাপড়ির গল্পটি শুধু একজন রোগা মেয়ের গল্প নয়। আমাদের সমাজে শিশুদের গায়ের রং, ওজন, উচ্চতা, মুখের আকৃতি, নাক, চুল কিংবা অন্য কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে মন্তব্য করাকে খুব স্বাভাবিক মনে করা হয়। কাউকে “কালো”, কাউকে “মোটা”, কাউকে “চিকন” বলে ডাকা হয়। অনেক সময় এসব কথাকে আদর বা মজা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একটি শিশু যখন বারবার নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য শোনে, তখন সে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা গড়ে তুলতে পারে। তার মনে হতে পারে, অন্যের গ্রহণযোগ্য পাওয়ার জন্য তাকে নিজের চেহারা বদলাতে হবে।
একটি শিশুর শরীর অন্যের বিনোদনের বিষয় নয়। তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপহাস করা তার আত্মসম্মানকে আঘাত করতে পারে এবং তাকে বৈষম্যের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে। শিশু অধিকার সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বৈষম্য থেকে সুরক্ষার নীতি এবং ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সুনামের সুরক্ষার বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে। তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, আমরা শিশুদের কী নামে ডাকছি। প্রশ্ন হলো, আমাদের কথার কারণে তারা নিজেদের কীভাবে দেখতে শিখছে। আমরা কি তাদের নিজেদের শরীরকে সম্মান করতে শেখাচ্ছি নাকি এমন এক পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করছি, যেখানে অন্যের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার আগে তাদের নিজের অস্তিত্ব নিয়েই লজ্জিত হতে হবে?
শিশুকে শাসনের নামে নির্যাতন-সহিংসতা
শায়ানের ছোটবেলা কেটেছে এমন একটি বাড়িতে যেখানে শান্তির চেয়ে ভয়ের উপস্থিতিই ছিল বেশি। তার বাবা ছিলেন অত্যন্ত রাগী ও প্রভুত্বকামী। সামান্য কোনো কারণে মায়ের ওপর চিৎকার করা, গালাগালি করা কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করা তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। শায়ান ছোট ছিল। বাবার আচরণ থামানোর ক্ষমতা তার ছিল না। সে শুধু এক কোণে দাঁড়িয়ে মাকে মার খেতে দেখত আর ভয়ে কাঁপত। প্রতিবার বাবার রাগ দেখলেই তার মনে হতো, এবার কী হবে? ধীরে ধীরে বাড়ির দরজা খোলার শব্দ, বাবার পায়ের শব্দ কিংবা কণ্ঠস্বরও তার মধ্যে ভয় তৈরি করতে শুরু করে।
কোনো জিনিস ভুল করে ভেঙে ফেললে তার বুক ধড়ফড় করত। সে ভাবত, বাবা জানলে কী হবে? ছোট একটি ভুলও তার কাছে বড় বিপদের মতো মনে হতো। নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতেও সে দ্বিধা করত। নতুন কোনো জামা, খেলনা কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিস চাইতে গিয়েও মনে হতো, বাবা যদি রেগে যান? কখনো শাস্তি হিসেবে তার বাবা তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথরুমে আটকে রাখতেন। একটি শিশুর জন্য এমন অভিজ্ঞতা শুধু শাস্তি নয়, এটি ভয়, অসহায়ত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা। সে জানত না কখন দরজা খুলবে, কী করলে আবার শাস্তি পেতে হবে। নিজের বাড়িতেই তার কাছে নিরাপদ কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না। একটি শিশুর কাছে বাড়ি হওয়ার কথা এমন একটি জায়গা, যেখানে সে ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ পাবে, কাঁদলে সান্ত্বনা পাবে এবং ভয় পেলে কারও কাছে আশ্রয় চাইতে পারবে। কিন্তু শায়ানের কাছে বাড়িই যদি ভয়ের উৎস হয়ে ওঠে, তাহলে সে নিরাপত্তা খুঁজবে কোথায়?
পারিবারিক সহিংসতা প্রত্যক্ষ করা এবং নিয়মিত ভয় ও নির্যাতনের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুর মানসিক সুস্থতা, ঘুম, মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সব শিশুর প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না, তবে দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। শিশু অধিকার সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, নির্যাতন, অবহেলা ও দুর্ব্যবহার থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছে। ৩৭ নম্বর অনুচ্ছেদেও শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ ও শাস্তি নিষিদ্ধ করার নীতি রয়েছে।
শিশুকে শাসন করার নামে ভয় দেখানো, অপমান করা, মারধর করা কিংবা দীর্ঘ সময় আটকে রাখা সুস্থ শৃঙ্খলা শেখানোর পদ্ধতি নয়। ভুল করলে তাকে বোঝানো যায়, সীমারেখা শেখানো যায় এবং নিজের কাজের দায়িত্ব নিতে সাহায্য করা যায়, নির্যাতন ছাড়াই। শায়ানের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি শিশু যখন নিয়মিত সহিংসতা দেখে, তখন সে শুধু একজন দর্শক থাকে না। সেই ভয় তার শৈশবের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায়।
পরিবারের কাছে যখন অনিরাপদ শিশু
ফারজানার মামা প্রায়ই তাদের বাসায় আসতেন। ছোটবেলা থেকেই ফারজানার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। মামা এলে সে তার সঙ্গে খেলত, গল্প করত। পরিবারের সবাই তাকে আপন মানুষ হিসেবেই দেখত। কিন্তু একসময় সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মামা তার সঙ্গে অনুচিত স্পর্শ ও যৌন নির্যাতনমূলক আচরণ করেন। ফারজানা ভয় পেয়ে যায়। কী ঘটেছে, তা নিয়ে কথা বলতেও তার ভয় লাগত। সে বুঝতে পারছিল না, এতদিন যাকে বিশ্বাস করেছে, তিনি কীভাবে তার সঙ্গে এমন কিছু করতে পারেন। অনেক দিন চুপ থাকার পর একদিন ফারজানা সাহস করে মাকে সবকিছু বলে। হয়তো সে ভেবেছিল, মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলবেন, “তুমি কোনো ভুল করোনি। আমি তোমার পাশে আছি।” কিন্তু তার বদলে মা রেগে যান। তাকে বকাঝকা করেন এবং প্রশ্ন করেন, সে কেন মামার সঙ্গে এত মিশত, কেন তার কাছে যেত, কেন আগে বলেনি। তার পোশাক, চলাফেরা ও আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এমনভাবে তাকে লজ্জিত করা হয়, যেন ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য ফারজানারও দায় ছিল।
ফারজানা এরপর আরও চুপ হয়ে যায়। যে সাহস করে প্রথমবার মাকে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলেছিল, সেই শিশুই এবার ভাবতে শুরু করে, “আমি কি সত্যিই কোনো ভুল করেছি?” তার মধ্যে লজ্জা, অপরাধবোধ, ভয় ও নিজের ওপর সন্দেহ তৈরি হতে থাকে। সে হয়তো আর কখনো এমন কোনো ঘটনা প্রকাশ করার সাহস পাবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু সত্যিটা হলো, যৌন নির্যাতনের জন্য শিশুটি কখনোই দায়ী নয়। সে কার সঙ্গে খেলেছে, কাকে বিশ্বাস করেছে, কী পোশাক পরেছে কিংবা কোথায় ছিল, কোনো কিছুই কাউকে তার সঙ্গে যৌন নির্যাতনমূলক আচরণ করার অধিকার দেয় না।
একটি শিশু যখন নির্যাতনের কথা বলে, তখন তাকে অবিশ্বাস করা, দোষারোপ করা বা চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাকে আরও অসহায় করে দিতে পারে। তার প্রথম প্রয়োজন হলো নিরাপত্তা, বিশ্বাস, সহানুভূতি এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ১৯ ও ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদ যথাক্রমে নির্যাতন থেকে সুরক্ষা এবং যৌন শোষণ ও যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তুলে ধরে।
ফারজানার গল্প আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে একটি শিশু যদি নিজের পরিবারের কাছেই নিরাপদে কথা বলতে না পারে, তাহলে সে সাহায্য চাইবে কার কাছে? যে শিশুটি নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাকে যদি নিজের পোশাক, বিশ্বাস কিংবা নীরবতার জন্য দায়ী করা হয়, তাহলে অপরাধীর দায় আড়াল হয়ে যায়। শিশুটির কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন এক ক্ষত। নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্যও তাকে লজ্জিত হতে হয়।
পরিবারের কাছে যখন শিশুর অনুভূতি উপেক্ষিত
রায়ানের বাবা মা দুজনেই কাজ করতেন। সংসারে খুব বেশি অভাব ছিল না, কিন্তু রায়ানের মৌলিক চাহিদাগুলো প্রায়ই গুরুত্ব পেত না। সে সময়মতো খেয়েছে কি না, রাতে ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া দরকার কি না, এসব বিষয়ে খুব একটা খোঁজ নেওয়া হতো না। রায়ান অনেক সময় সকালে নাশতা না করেই স্কুলে চলে যেত। ক্ষুধা লাগলেও কাউকে বলত না। কারণ সে জানত, তার কথা শুনে হয়তো বলা হবে, “পরে খেয়ে নিস।” ধীরে ধীরে নিজের প্রয়োজনের কথা বলতেও তার অস্বস্তি হতে শুরু করল। তার মনে হতো, “আমার এসব চাওয়া কি সত্যিই এত গুরুত্বপূর্ণ?”
একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় তার জ্বর ছিল। শরীর দুর্বল লাগছিল, মাথাও ভার হয়ে ছিল। সে মাকে বলেছিল, “আজকে কি আমি স্কুলে না গেলে হয়?” কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যে তার কথাটা গুরুত্ব পেল না। শেষ পর্যন্ত অসুস্থ শরীর নিয়েই তাকে স্কুলে যেতে হলো। শুধু খাবার, চিকিৎসা কিংবা ঘুমের ক্ষেত্রেই নয়, বাবা মায়ের কাছ থেকেও রায়ান ধীরে ধীরে অবহেলা অনুভব করতে থাকে। তারা তাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতেন না, একসঙ্গে বসে গল্প করতেন না, তার স্কুলের দিন কেমন গেল সেটাও জানতে চাইতেন না। একই বাড়িতে থেকেও যেন তাদের মধ্যে অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল।
ছোটবেলায় রায়ান হয়তো বাবা মাকে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে করত। কিন্তু যখন বারবার তার কথা শোনা হয় না, তার সঙ্গে সময় কাটানো হয় না এবং তার অনুভূতিগুলো গুরুত্ব পায় না, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের জগত তাদের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করে। তার জীবনে কী ঘটছে, সে কী নিয়ে চিন্তিত কিংবা কী নিয়ে খুশি, এসব আর সে বাবা মাকে বলতে চাইত না। একসময় সে বুঝতেই না পেরে তাদের কাছ থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে থাকে।
সব অবহেলা ইচ্ছাকৃত নয়। কাজের চাপ, আর্থিক সমস্যা, অসুস্থতা কিংবা মানসিক চাপের কারণে বাবা মায়ের পক্ষে সন্তানের সব প্রয়োজন পূরণ করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শিশুর মৌলিক প্রয়োজন ও অনুভূতি উপেক্ষিত হলে তার সুস্থ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিবিএস ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ (MICS 2025) চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশের গত এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আক্রমণের অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে, জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুযায়ী, দেশের ২৮.৯ শতাংশ শিশু একাধিক মৌলিক ক্ষেত্রে বঞ্চনার মধ্যে রয়েছে। এই দুটি পরিসংখ্যান অবহেলার সরাসরি হার নির্দেশ করে না। তবে এগুলো দেখায়, শিশুদের নিরাপত্তা, যত্ন, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
শিশু অধিকার সনদের ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্যসেবার অধিকার, ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে যথাযথ জীবনযাত্রার মান এবং ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। শিশুর প্রয়োজন মানে শুধু খাবার, পোশাক ও একটি থাকার জায়গা নয়। তার অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রাম, পড়াশোনায় সহায়তা, নিরাপদ পরিবেশ এবং নিজের কথা বলার মতো সম্পর্কও দরকার। রায়ানের মতো শিশুরা সব সময় অভিযোগ করে না। তারা হয়তো শুধু চুপ হয়ে যায়, নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয় এবং সাহায্য চাওয়ার আগেই ধরে নেয় যে কেউ সাড়া দেবে না। কখনো কখনো একটি শিশু বাবা মায়ের কাছে খুব বেশি কিছু চায় না। সে শুধু চায়, কেউ তার ক্লান্তি লক্ষ করুক, অসুস্থ হলে পাশে বসুক, স্কুল থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করুক দিনটা কেমন গেল। এই ছোট ছোট চাওয়াগুলোও যখন বারবার অপূর্ণ থাকে, তখন শিশুটি শিখতে পারে যে তার অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর একটি শিশুর কাছে নিজের অনুভূতির মূল্য হারিয়ে ফেলা কতটা গভীর অভিজ্ঞতা, তা বাইরে থেকে সব সময় বোঝা যায় না।
বাবা-মায়ের ত্যাগের গল্প সন্তানকে অপরাধবোধে ভোগায়
নীলার বাবা-মা প্রায়ই তাকে মনে করিয়ে দেন, তার জন্য তারা কত কিছু করেছেন। কখনো বলেন, “তোমার জন্য নিজের শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছি।” কখনো বলেন, “তোমাকে ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য কত কষ্ট করছি, সেটা তুমি বুঝবে না।” আবার কোনো বিষয়ে নীলা নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করলে কিংবা বাবা-মায়ের কোনো আচরণে কষ্ট পেয়ে তা জানালে তারা বলে ওঠেন, “তোমার জন্য এত কিছু করলাম, আর এখন তুমিই আমাদের কথা শোনাও?” কথাগুলো হয়তো নিজেদের ত্যাগ বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলা হয়। কিন্তু নীলার কাছে সেগুলো ধীরে ধীরে অপরাধবোধের কারণ হয়ে ওঠে। তার মনে হতে থাকে, বাবা-মা তার জন্য এত কিছু করেছেন বলে তাদের কোনো কথায় কষ্ট পাওয়া, কোনো বিষয়ে দ্বিমত করা কিংবা নিজের চাওয়া প্রকাশ করা তার উচিত নয়।
বাবা-মা কষ্ট পাবেন ভেবে সে নিজের অনুভূতি লুকাতে শুরু করে। কোনো কিছুতে মন খারাপ হলেও জানায় না। কোনো সিদ্ধান্তে আপত্তি থাকলেও নিজের মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধা করে। কারণ তার মনে হয়, নিজের কথা বললেই আবার শুনতে হবে, তার জন্য কত টাকা খরচ করা হয়েছে, কত কষ্ট করা হয়েছে, কত কিছু ত্যাগ করা হয়েছে। এভাবে বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা ধীরে ধীরে নীলার মনে বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়। সে হয়তো বাবা-মাকে ভালোবাসে, তাদের পরিশ্রমও বোঝে, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতাটুকুও হারাতে থাকে।
বাবা-মায়ের ত্যাগ অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। সন্তানকে বড় করতে গিয়ে তাদের যে পরিশ্রম, অর্থ ও সময় ব্যয় হয়, তা মূল্যবান। কিন্তু সেই ত্যাগের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়ে সন্তানকে অপরাধবোধে ভোগানো এবং তার প্রতিটি অনুভূতি বা মতামতকে অকৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখা স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ নয়। সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা অভিভাবকের দায়িত্বের অংশ। এসবের বিনিময়ে সন্তানের কাছ থেকে নিঃশর্ত আনুগত্য দাবি করা কিংবা তার অনুভূতি প্রকাশের অধিকার অস্বীকার করা যায় না।
শিশু অধিকার সনদের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুর মতামত প্রকাশের অধিকার এবং সেই মতামতকে তার বয়স ও পরিপক্বতা অনুযায়ী গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মানসিক সহিংসতা থেকেও সুরক্ষার বিষয়টি স্বীকৃত। কোনো শিশু বাবা-মায়ের কোনো আচরণে কষ্ট পেলে তা জানানো মানেই সে তাদের ত্যাগ অস্বীকার করছে না। বাবা-মাকে ভালোবাসা এবং তাদের কোনো কথায় আঘাত পাওয়া একই সঙ্গে সম্ভব। একটি শিশুকে এমন শিক্ষা দেওয়া জরুরি, যাতে সে বাবা ম-য়ের পরিশ্রমের মূল্য বোঝে, তাদের সম্মান করে, আবার নিজের কষ্টের কথাও নির্ভয়ে বলতে পারে। কারণ ভালোবাসা যদি সব সময় ঋণের মতো অনুভূত হয়, তাহলে শিশুটি হয়তো সম্পর্কটি বজায় রাখবে, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভেতরে নিজের অনুভূতি নিয়ে আর নিরাপদ বোধ করবে না।
বাবা-মায়ের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত শিশুর প্রতিভা সংকুচিত করে
আরিবার বাবা-মা চান তাদের মেয়ে জীবনে ভালো করুক। তারা চান আরিবা ভালোভাবে পড়াশোনা করুক, ভালো মানুষ হোক এবং ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হোক। এই চাওয়া থেকেই ছোটবেলা থেকে তার জীবনের প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই নিয়ে আসছেন। কোন স্কুলে পড়বে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, কী পোশাক পরবে, অবসর সময়ে কী করবে, কোন বিষয়ে পড়াশোনা করবে, এমনকি ভবিষ্যতে কী পেশায় যাবে, সবকিছুতেই বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
আরিবা নিজের কোনো পছন্দের কথা জানালে প্রায়ই তাকে শুনতে হয়, “তুমি এখনো ছোট, তুমি বুঝবে না”, “আমরা তোমার ভালোর জন্যই বলছি” কিংবা “আমরা যা বলব, তোমার সেটাই করা উচিত।” ধীরে ধীরে আরিবা নিজের ইচ্ছার চেয়ে বাবা-মায়ের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়াই নিরাপদ মনে করতে শেখে। বন্ধুরা কোথাও ঘুরতে গেলে আরিবা যেতে চাইত কিন্তু বাবা-মা অনুমতি না দিলে তার আর যাওয়া হতো না। নিজের পছন্দের পোশাক পরতে চাইলে শুনতে হতো, কোন পোশাক তার জন্য উপযুক্ত, তা বাবা-মাই ভালো জানেন। ছবি আঁকা কিংবা অন্য কোনো শখ নিয়ে সময় কাটাতে চাইলে তাকে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার কথা বলা হতো।
এভাবে নিজের পছন্দ প্রকাশ করলেও যখন বারবার তা বাতিল হয়ে যেত, তখন আরিবা ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছার কথাই কম বলতে শুরু করে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে তার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে। আরিবার নিজের কিছু স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেগুলো বাবা-মায়ের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। সে নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলেও মনে হয়, তার মতামতের কোনো মূল্য নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরিবা ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও দ্বিধায় পড়তে শুরু করে। কোন বিষয়টি বেছে নেবে, কোন সুযোগটি গ্রহণ করবে কিংবা কোনো সমস্যার সমাধান কীভাবে করবে, এসব ক্ষেত্রে সে বারবার অন্যের পরামর্শ ও অনুমোদন খোঁজে।
নিজের সিদ্ধান্ত ভুল হলে কী হবে, সেই ভয় তাকে আটকে দেয়। কারণ ছোটবেলা থেকে সে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে অন্যের সিদ্ধান্ত মেনে চলতেই বেশি অভ্যস্ত হয়েছে। কিন্তু একসময় পরিস্থিতি বদলে যায়। যে বাবা-মা ছোটবেলা থেকে আরিবার হয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছেন তারাই এখন তাকে বলেন, “তুমি নিজের থেকে কিছুই করতে পারো না? “নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শেখোনি?” কথাগুলো শুনে আরিবা চুপ করে যায়। সে বুঝতে পারে না, এতদিন যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তাকে দেওয়া হয়নি, আজ সেই সিদ্ধান্ত নিজে নিতে না পারার জন্য তাকেই কেন দোষী হতে হচ্ছে। যখনই সে নিজের পছন্দ অনুযায়ী কিছু করতে চেয়েছে, তখনই তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়নি, নিজের সিদ্ধান্তের ফলাফল থেকে শেখার সুযোগও পায়নি। অথচ এখন তার কাছেই আশা করা হচ্ছে, সে একাই সবকিছু বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
আরিবার গল্পটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয় শিশুকে সব ভুল থেকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই না দেওয়া হয়, তাহলে সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ও নিজের ওপর আস্থা রাখতে শিখবে কীভাবে? শিশু অধিকার সনদের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে তার ব্যক্তিত্ব, প্রতিভা ও সামর্থ্যের পূর্ণ বিকাশে শিক্ষার ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।
শিশুর অধিকার মানে তাকে কোনো সীমা ছাড়া সবকিছু করতে দেওয়া নয়। বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো তাকে নিরাপদ রাখা, সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বোঝানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু পরামর্শ দেওয়া আর সন্তানের হয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া এক বিষয় নয়। শিশুকে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে দিলে সে নিজের পছন্দ বুঝতে শেখে, ভুল করলে তা থেকে শিক্ষা নেয় এবং ধীরে ধীরে দায়িত্ব নিতে পারে। সব সিদ্ধান্ত সঠিক হবে, এমন নয়। কিন্তু ভুল করার সুযোগও শেখার একটি অংশ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে দক্ষতা শেখার সুযোগ একটি শিশুকে দেওয়া হয়নি, সেই দক্ষতার অভাবের জন্য বড় হয়ে তাকে দোষারোপ করা ন্যায্য নয়। সন্তানকে বড় করার অর্থ শুধু তার জন্য সঠিক পথটি বেছে দেওয়া নয়, বরং তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে একদিন সে নিজেই নিজের জন্য উপযুক্ত পথ বেছে নিতে পারে।
বাবা-মায়ের ব্যবহার যখন শিশুরা অনুকরণ করে
নাবিলের বাবা প্রায়ই আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সামনে গর্ব করে বলেন, “আমি আমার সন্তানদের গায়ে কখনো হাত তুলি না। আমি চাই না ওরা আমার ভয়ে বড় হোক।” কথাটা শুনে সবাই তাকে একজন ভালো বাবা হিসেবেই দেখেন। কিন্তু বন্ধ দরজার ওপাশে নাবিলের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাবিলের বাবা-মা দুজনই প্রায় প্রতিটি কথাই উচ্চস্বরে বলতেন। সামান্য কোনো ভুল, মতের অমিল কিংবা সাধারণ কোনো প্রশ্ন থেকেও শুরু হয়ে যেত চিৎকার, তর্ক আর একে অপরকে দোষারোপ করা। বাবার কাছে নিজের মত প্রকাশ করতে গেলে নাবিলকে প্রায়ই শুনতে হতো, “বড়দের মুখে মুখে কথা বলিস কেন?” অথচ বাড়িতে কোনো বিষয়ে মতের অমিল হলেই বাবা-মা নিজেরা উচ্চস্বরে কথা বলতেন, রাগের মাথায় অপমানজনক কথা বলতেন এবং ভুল স্বীকার করার বদলে একে অপরকে দোষ দিতেন।
ছোটবেলায় নাবিল এসব আচরণ চুপচাপ দেখত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেও একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করল। কোনো কিছু পছন্দ না হলে চিৎকার করে কথা বলত, নিজের ভুল ধরিয়ে দিলে তর্কে জড়িয়ে পড়ত, এমনকি কখনো বাবা-মায়ের সঙ্গে এমন ভাষায় কথা বলত, যা শুনে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতেন। তখন তারা অভিযোগ করতেন, “তুই দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস! বড়দের সম্মান করতে শিখিসনি?”
কিন্তু তারা হয়তো খেয়াল করতেন না, নাবিল যে আচরণ করছে, তার অনেকটাই সে প্রতিদিন নিজের বাড়িতেই দেখে শিখেছে। শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে বড় হয় না, তারা চারপাশের মানুষের আচরণও পর্যবেক্ষণ করে এবং অনুকরণ করতে শেখে। বাড়িতে যদি মতের অমিল হলেই চিৎকার করা হয়, ভুল স্বীকার করাকে দুর্বলতা মনে করা হয় কিংবা রাগ প্রকাশের জন্য অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করা হয়, তাহলে শিশুর কাছেও এসব আচরণ স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। অবশ্য প্রতিটি শিশু একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কেউ তর্কপ্রবণ হয়ে ওঠে, কেউ আবার ভয়ে চুপ করে যায়, নিজের কথা প্রকাশ করতে শেখে না।
নাবিলের বাবা শুধু উচ্চস্বরে কথা বলেই থেমে থাকতেন না। কখনো অন্যের সঙ্গে তুলনা করে বলতেন, “অমুকের ছেলেকে দেখ, আর তোকে দেখ!” কোনো ভুল হলে বলতেন, “তোর দ্বারা জীবনে কিছুই হবে না।” নাবিল নিজের কষ্টের কথা জানাতে চাইলে শুনতে হতো, “এত নাটক করিস কেন?” আর নিজের আচরণের জন্য প্রশ্নের মুখে পড়লে বাবা বলতেন, “আমি তোর ভালোর জন্যই বলি।” কখনো কয়েক দিন কথা না বলে থাকা, ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা কিংবা পরিবারের অন্যদের সামনে অপমান করাও হয়ে উঠত তাকে শাসন করার উপায়।
প্রথম দিকে নাবিল কাঁদত, প্রতিবাদ করত কিংবা বোঝানোর চেষ্টা করত যে কথাগুলো তাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু প্রতিবারই উত্তর আসত, “সত্যি কথা শুনতে এত কষ্ট হয় কেন?”, “আমি তোকে মারধর করি না, তবু এত অভিযোগ কীসের?” ধীরে ধীরে নাবিল নিজের কষ্টের কথা বলা বন্ধ করে দিল। অথচ তার ভেতরে জমে থাকা রাগ ও হতাশা অন্যভাবে প্রকাশ পেতে লাগল। কখনো সে ছোটদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ত। বাড়িতে যে আচরণ তাকে কষ্ট দিত, অজান্তেই কখনো সে সেই আচরণ অন্যদের সঙ্গে করতে শুরু করল।
নাবিলের গল্পটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়। শিশুকে না মারলেই যে তার সঙ্গে ভালো আচরণ করা হচ্ছে, তা নয়। অপমান করা, গালাগালি দেওয়া, অন্যের সঙ্গে তুলনা করে ছোট করা, বারবার অযোগ্য বলা, সন্তানের অনুভূতিকে তুচ্ছ করা, নিজের ভুলের দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিংবা রাগের সময় তাকে ভয় দেখানোও তার মানসিক সুস্থতা ও আত্মসম্মানে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুর সামনে প্রতিনিয়ত চিৎকার করা, তাকে কথা বলতে না দেওয়া, সব সময় নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এবং তার প্রতিটি প্রতিবাদকে বেয়াদবি হিসেবে দেখা তার শেখার ও সম্পর্ক গড়ার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, নির্যাতন এবং দুর্ব্যবহার থেকে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। ইউনিসেফও শিশুদের সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষিত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে। শিশুর অধিকার শুধু মারধর থেকে বেঁচে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তার মানসিক নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সুস্থ বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা সন্তানের ভুল সংশোধন করতে পারেন, নিয়ম শেখাতে পারেন এবং প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য কখনোই অপমান, ভয় দেখানো কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার অজুহাত হতে পারে না।
অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেন, সন্তান তাদের সম্মান করে না, কথায় কথায় তর্ক করে, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কিংবা অন্যের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। কিন্তু তারা কি কখনো ভেবে দেখেন, সন্তান প্রতিদিন তাদের কাছ থেকে কী শিখছে? শিশুকে শান্তভাবে কথা বলতে বলার আগে তার সামনে শান্তভাবে কথা বলা, নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখানোর আগে নিজের ভুল স্বীকার করা এবং সম্মান দাবি করার পাশাপাশি তাকে সম্মান দেওয়াও জরুরি। শিশুর প্রতিটি আচরণের জন্য বাবা-মা একমাত্র দায়ী নন, কিন্তু তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও আচরণ শেখার প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানকে শুধু কী করতে হবে তা বলে দিলেই হয় না, তাকে দেখিয়েও দিতে হয় কীভাবে তা করতে হয়। শিশুরা বড়দের মুখের কথা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু প্রতিদিনের আচরণ থেকে শেখা অভ্যাস অনেক সময় তাদের সঙ্গে থেকে যায়। তাই ভালো বাবা-মা হওয়ার অর্থ শুধু সন্তানকে শারীরিকভাবে আঘাত না করা নয় বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মতের অমিল চিৎকারে নয়, আলোচনায় মেটে। ভুলের প্রতিক্রিয়া অপমানে নয়, সংশোধনের সুযোগে প্রকাশ পায় এবং ভালোবাসা কখনো ভয় দেখানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে না।
উপরের গল্পগুলো ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে একটি মিল রয়েছে. প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিশুর কোনো না কোনো মৌলিক প্রয়োজন, অনুভূতি, মর্যাদা কিংবা অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে। শিশু অধিকার শুধু খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও স্কুলে যাওয়ার সুযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত মর্যাদা, মতামত প্রকাশ, স্বাস্থ্যসেবা, বিশ্রাম, খেলাধুলা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার অধিকারও রয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে এসব অধিকারের বিভিন্ন দিক স্বীকৃত হয়েছে। এর গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে রয়েছে- অনুচ্ছেদ ২: বৈষম্য থেকে সুরক্ষা। অনুচ্ছেদ ৩: শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। অনুচ্ছেদ ১২: শিশুর মতামত প্রকাশের অধিকার এবং তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। অনুচ্ছেদ ১৬: ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা ও সুনামের সুরক্ষা। অনুচ্ছেদ ১৯: শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, নির্যাতন, অবহেলা ও দুর্ব্যবহার থেকে সুরক্ষা। অনুচ্ছেদ ২৪: স্বাস্থ্যসেবা ও সুস্বাস্থ্যের অধিকার। অনুচ্ছেদ ২৭: শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের উপযোগী জীবনযাত্রার মান। অনুচ্ছেদ ২৮ ও২৯: শিক্ষা এবং ব্যক্তিত্ব, প্রতিভা ও সামর্থ্যের বিকাশ। অনুচ্ছেদ ৩১: বিশ্রাম, অবসর, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার। অনুচ্ছেদ ৩৪: যৌন শোষণ ও যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা।
এই অধিকারগুলো মনে করিয়ে দেয় যে শিশুকে ভালোবাসা এবং তার অধিকার রক্ষা করা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং শিশুকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসার অর্থই হলো তার মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া। শিশু ভুল করবে, প্রশ্ন করবে, নিজের পছন্দ প্রকাশ করবে এবং কখনো কখনো বড়দের সঙ্গে দ্বিমতও পোষণ করবে। এসবকে সব সময় অবাধ্যতা হিসেবে দেখলে তার চিন্তা ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
একই সঙ্গে, বাবা-মাও মানুষ। তাদের ক্লান্তি, সীমাবদ্ধতা ও ভুল থাকতে পারে। প্রতিটি ভুল আচরণকে ইচ্ছাকৃত নির্যাতন বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ভালো উদ্দেশ্য ছিল বলে ক্ষতিকর আচরণকে অস্বীকার করাও ঠিক নয়। প্রয়োজন হলো সচেতনতা, দায়িত্ববোধ, ভুল হলে তা স্বীকার করার মানসিকতা এবং সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা।