মোমিন মেহেদী | ২৬ অক্টোবর, ২০১৬
খাদিজার অবস্থা আরেকটু ভালো। খারাপ-ই তো চাইনি কখনো, তাহলে আর এই খারাপ থেকে ভালোর খবরের কি প্রয়োজন? প্রশ্নটা এভাবেই বারবার ফিরে ফিরে আসছিলো। উত্তরটা আমার তো নয়-ই; হয় তো আমাদের সরকার প্রধানেরও জানা নেই। কেননা, নিজের অজান্তেই তিনি নিয়ম করে জন্ম দিয়ে চলেছেন আওয়ামী লীগ+জামাতি= লীগজামাতি নামক শঙ্কর প্রজাতির রাজনীতিক। আর এই রাজনীতিকদের কারণেই সিলেটের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে সমস্যার রাজত্ব। সেখানে ছাত্রলীগ নেতা নামধারী বদরুলের চাপাতির কোপে নির্মমভাবে আহত হয় আমাদের-ই কারো না কারো বোন খাদিজা বেগম নার্গিস। সেই মেয়েটির শারীরিক অবস্থা খুব ধীরে ধীরে উন্নতির পথে বলে যে আশ্বাসের বানী ছড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বর্তমান; সেই বর্তমানকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, জনগণ কিন্তু কাউকে কোপানোর পর আবার তার আরোগ্যের সংবাদ জানতে চায় না। তারা চায় অনবরত ভালো থাকা-ভালো রাখা।
কেবলমাত্র প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ৩ অক্টোবর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম সিলেট এমসি কলেজের পুকুর পাড়ে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এই হামলার পরপরই একদল উঠে পড়ে লেগেছে, খাদিজার ঘটনার ‘দায়ভার’ ছাত্রলীগকে নিতে হবে বলে। যেন ছাত্রলীগ দায় স্বীকার করলেই ‘মেয়েটি’ সুস্থ হয়ে যাবে! আরেকদল উঠে পড়ে লেগেছে, ঘটনার সাথে ছাত্রলীগের কেউ ‘জড়িত’ নয় বলে। যেন ছাত্রলীগের কেউ জড়িত নয় প্রমাণ করতে পারলেই মেয়েটি সুস্থ হয়ে যাবে!
কি রেখে কি হবে? কি হবে না। তা নিয়ে ভাবার চেয়ে আমাদের সবার আগে যা করা উচিৎ, তা হলো তনু, রিশাসহ সকল ধর্ষণ ও হত্যাকারীর বিচার যেন ৩ মাসের মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কার্যকর করে; এজন্য নিরন্তর আন্দোলনে নেমে যাওয়া। তা না করতে পারলে আরো দৃঢ় ও বদ সাহসী হয়ে উঠবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জারজ হিসেবে ব্যাপক সমালোচিত বর্তমান ছাত্রলীগের রাতের যাত্রীরা। যাদের ইমেজ যে ‘পবিত্র ইমেজ’ সে সম্পর্কে দেশের শিশু আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই অবগত। কি হতো ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ‘ওরা ছাত্রলীগের কেউ নয়’ না বলে ‘আমরা এমন কর্মীর জন্য লজ্জিত’ বললে? মেয়েটির সাথে যে বিভীষিকাময় ঘটনা ঘটেছে তার শাস্তি দাবি করলে? মানুষ স্বস্তি পেত এটা ভেবে যে, আপনারা শুধু ছাত্রলীগ না, মানুষও। এই পর্যন্ত কেউ কখনো দেখেছেন, ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে ছাত্রলীগ কোনো সভা সমাবেশ করেছে। এত বড় সংগঠন, দেশে ঘটে যাওয়া এত এত ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, হত্যার প্রতিবাদে পাঁচজন কর্মী রাস্তায় নেমেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ব্যাপক ব্যস্ত থাকে সারা বছর। নেতার প্রত্যাবর্তন, কুলখানি, জন্মদিন, নেতার অপমান, পুরস্কারপ্রাপ্তি, জাতিসংঘে ভাষণ, বিশ্বনেতাদের সাথে বৈঠক নানান ইস্যুতে ছাত্রলীগ সভা সমাবেশ করে, কই বর্ষবরণে যৌন হয়রানির ঘটনায় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তো একজন কর্মীকেও রাস্তায় নামতে দেখিনি। এত বড় ছাত্র সংগঠন, এত বড় কমিটি, তৈরি হয়েছে কি শুধু দলীয় নেতাদের পা চাটা আর জিকির করার জন্য? কোনো ছাত্র সংগঠনের নেতা হবার পর শতকোটি টাকার মালিক হবার নজির বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও সম্ভব না? দেশের মন্ত্রী হবার পর কোটি কোটি টাকা যে লুটে পুটে খাবে তার প্রাকটিস ছাত্র অবস্থাতেই শুরু করে এরা। চোখ বন্ধ করে থাকলেই কাকের বিষ্ঠা থেকে বেচে যাবে, এমনটা কেউ ভাবলে তাদের জন্য করুণা! বদরুলের মতো চরিত্রের ছাত্রলীগের কর্মী এবং তার কঠোর শাস্তির দাবিতে ছাত্রলীগই রাস্তায় নামুক, সত্যিকারেই যদি এরা দেশ ও মানুষের মঙ্গলের রাজনীতির অঙ্গীকার নিয়ে এসে থাকে।
ছাত্রলীগের বদরুল চরিত্রের নেতাকর্মী যারা, তারা এবং নির্যাতক মানসিকতার পুরুষদের জেনে রাখা উচিৎ যে, জোরপূর্বক যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়া কিংবা যৌনমিলনে বাধ্য করাকেই ‘ধর্ষণ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। যা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর অপরাধ। ধর্ষণ এক প্রকার যৌন অত্যাচার। সমাজ বিজ্ঞানীরা ধর্ষণের সঠিক প্রভাবক আবিষ্কার করতে না পারলেও, সেইডো- ম্যাসগিজমের (Sadomasochism) কথা সবাই কমবেশি স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ ভিকটিমকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে লাঞ্ছিত করে ইন্দ্রিয় সুখ লাভ। সব মানুষের মধ্যে কিছু পশুত্ব সুপ্ত থাকে এবং মানবিক গুণাবলীর অনুপস্থিতিতে ক্রোধ, হতাশা বা প্রতিশোধ পরায়ণতার কারণে সেই পশুত্বের প্রকাশ ঘটে। তবে আমার মতে ভিকটিমের ধর্ষণোত্তর জটিলতা অর্থাৎ পোষ্ট কন্ডিশন, বিচারে লঘু দণ্ড বা কোনো মতে রক্ষা পাবার আশা ধর্ষণের মুল প্রণোদনা। অন্তত আমাদের দেশের জন্য। এই অবস্থায় আমাদের রাজনীতি সচেতন নতুন প্রজন্মের একটাই দাবী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে ধর্ষক-নারী নির্যাতক ও ঘাতকের ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। তাহলেই কেবল পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন ১০ জন নারী ধর্ষণের যে তথ্য দিয়েছে, তা কমানো সম্ভব। কমানো সম্ভব, তাদের তথ্যানুযায়ী গত ১৬ বছরে (২০০১-২০১৬) ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৭ হাজার ৭৭০ জন নারীর আত্মার ক্রন্দন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য ওমেন-এর গবেষণা অনুযায়ী গত ১৬ বছরে ৫ হাজার ৩০০ শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৯৩৩ জন নারীকে। আরেক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে যে, শুধু ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে ৯৭২ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে গণধর্ষণ ও হত্যার শিকার ৪৬৩ নারী, তাছাড়া ধর্ষণের শিকার ৪৩৯ নারী ও ৭০ শিশু। অন্যদিকে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের পুরোনো প্রতিবেদনুযায়ী, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭২ জনকে, যৌতুকের কারণে নিহত ২৭০ জন নারী,ধর্ষণের শিকার ৬০২ জন যার ২২০ জন নারী ও ৩৮২ জন শিশু। পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালে ১১ মাসে নারী নির্যাতনের শিকার হয় ১৮ হাজার ৪৫ জন এবং এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩ হাজার ৪০৭ জন ও শিশু ধর্ষণের শিকার ১ হাজার ৫৫৭ জন।শুধু ১৮ হাজার ৪৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়নি বরং ১৮ হাজার ৪৫ টি পরিবার নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
এই বর্তমান থেকে উত্তরণের জন্য নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিবাদী হতে হবে, সোচ্চার হতে হবে, একই সাথে শালীন হতে হবে ব্যবহার- পোশাকসহ প্রতিটি কর্মে। সাথে সাথে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেহেতু নারী আছে, সেহেতু তাদের রক্ষার জন্য নারী ও শিশু রক্ষা ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে ৩ মাসের মধ্যে প্রমাণিত ঘাতক-ধর্ষক ও নির্যাতককে কমপক্ষে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু কার্যকর করতে হবে। এতে করে নারী লিপ্সু চরিত্রহীন রাজনীতিকদের দৌরাত্ম্য কিছুটা হলেও কমবে বলে আমি মনে করি।
একটা ঘটনা বলি, আমার পরিচিত এক নারীর কাছ থেকে শোনা। তিনি বললেন, সম্প্রতি একটি পাবলিক বাসে করে তিনি বাসায় ফিরছিলেন। এমন সময় দেখলেন যে, একজন শালীন পোশাক পরা নারী বাসে ওঠার সময় এক ষণ্ডা প্রকৃতির লোক তার গায়ে হাত দিলো। অমনি নারীটি ঘুরেই এক থাপ্পড় মারলেন। এতে পুরো বাসের লোকজন নারীটির বিরুদ্ধে দাড়িয়ে গেলো এবং নারীটিকে বাস থেকে নামানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো। প্রতিবাদী নারী তৎক্ষণাৎ সার্জেন্ট ডেকে বিষয়টি অবহিত করার পর সার্জেন্ট ওই পুরুষটিকে সবার সামনে নারীর কাছে ক্ষমা চাইতে বলে বিষয়টির সমাধান দিলেন।
আমার বিশ্বাস এভাবে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যদি ঘুরে দাঁড়ায় নারী; তাহলেই সম্ভব এই বদরুলদের মত জঘন্য মানসিকতার রাজনৈতিক পাষণ্ডগুলোকে প্রতিরোধ করা। তা না হলে কিন্তু রক্ষা নাই। কেননা, এদের বাপ-দাদারাও এদেরই মত ছিলো। তবে তাদের আর এদের মধ্যে পার্থক্য হলো, সেই হায়েনারা একাত্তর পরবর্তী সময়ে অসংখ্য ঘটনা ঘটালেও তা গণমাধ্যমে আসার সুযোগ পায় নি, এখন নতুন প্রজন্মের রাজনীতি-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি সচেতন প্রতিনিধিরা প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসে সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরছে কখনো সরাসরি অথবা কখনো নেপথ্য ঘটনাকে সামনে এনে। এই প্রযুক্তির যুগে গড়ে উঠুক আরো অসংখ্য প্রীতিলতা ব্রিগেড, গড়ে উঠুক সেভ দ্য ওমেন, গড়ে উঠুক ফোর্সেস অব বিউটি বাংলাদেশ। সমাপ্তির আগে একটি কথা বলি, আমরাই খুনি-নির্যাতক ও ধর্ষক। কেননা, আমরা ঘুরে দাঁড়াই না। যারা ঘুরে দাঁড়ায়, তাদেরকেও বাহবা দেই না। এই দায় থেকে যদি বাঁচতে চান নিবেদিত থেকে এগিয়ে যান নারী নির্যাতন-খুন-ধর্ষণের প্রতিবাদে, সচেতনতা তৈরি লক্ষে...
মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি। ইমেইল: mominmahadi@gmail.com