ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম | ২১ অক্টোবর, ২০২৫
ঝাড়ফুঁক (Folk Healing)
‘ঝাড়’ শব্দটির মূল উৎস সংস্কৃত ভাষা, যার ধাতু ‘ঝট’ বা ‘ঝর’—অর্থাৎ ঝেড়ে ফেলা, পরিষ্কার করা বা তাড়ানো (to sweep/cleanse)। বাংলা ভাষায় এটি নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন—’ঝাড়ু (Broom)’ মানে পরিষ্কারের যন্ত্র, ‘ঝাড়ফুঁক (Folk Healing)’ মানে ফুঁ দিয়ে অশুভ শক্তি বা রোগ তাড়ানো, ‘ঝাড়বাতি (Oil Lamps)’ মানে বহু বাতির সমষ্টি, যা আলো ছড়িয়ে দেয়।
আবার ‘ঝোপঝাড় (Bushes)’ শব্দে ‘ঝোপ’ এসেছে সংস্কৃত ‘ক্ষুপ’ থেকে, যার অর্থ ছোট গাছপালা বা লতাগুল্ম, আর ‘ঝাড়’ বোঝায় গুল্মের সমষ্টি বা ঘনবিন্যাস। ফলে ‘ঝাড়’ শব্দটি কখনো তাড়ানো বা পরিষ্কার করা (to drive away/cleanse), কখনো সমষ্টি বা ঘনত্ব (density) বোঝায়।
বাংলাদেশে ‘ঝাড়ফুঁক (Folk Healing)’ হলো কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অশিক্ষিত (uneducated) গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত এক লোকাচার। এটি মূলত ধর্মীয় আচ্ছাদনে মোড়ানো প্রতারণার রূপ (religiously masked deception), যেখানে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়।
অনেক ভণ্ড প্রতারক (fraudsters) পাগড়ি, টুপি, শেরওয়ানী বা আরবি পোশাক (Arabic attire) পরে নিজেদের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা কুরআন (Quran) ও হাদিস (Hadith)–এর আয়াত বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে, যেন মানুষ মনে করে এটি ইসলামসম্মত চিকিৎসা। অথচ বাস্তবে এটি শিরকমিশ্রিত (Shirk) এক লোকাচার—যার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।
রুকাইয়া (Ruqyah)
রুকাইয়া (Ruqyah) শব্দটি এসেছে আরবি মূল Raqa, যার অর্থ পড়া, উচ্চারণ বা দোয়ার মাধ্যমে আরোগ্য প্রার্থনা করা (recitation for healing)। ইসলামী শরীয়তে রুকাইয়া বলতে বোঝায়—আল্লাহর কালাম (Word of Allah), অর্থাৎ কোরআনের আয়াত ও সহিহ দোয়া পাঠের মাধ্যমে রোগ নিরাময়ের আল্লাহর সাহায্য কামনা করা হয়। এটি একটি ইবাদত (Worship), যা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাহায্যের জন্য করা হয়।
রুকাইয়া ও ঝাড়ফুঁক কি একই?
না। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। একটি ইবাদত (Worship), অন্যটি শিরক (Shirk)। ইসলাম পূর্ব যুগে আরবের মুশরিকদের মধ্যে ঝাড়ফুঁকের প্রচলন ছিল। ‘ঝাড়ফুঁক (Folk Healing)’ বা ‘তাবিজ-কবচ (Amulets)’ ব্যবহার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কুসংস্কার (Superstition) ও শিরক (Shirk)–এর মধ্যে পড়ে, কারণ এতে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি তাবিজ বা জাদু ব্যবহার করে, সে শিরক করেছে।’ — সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৮৮৩
কিছু কিছু তাফসীরে উল্লেখ আছে যে এক সাহাবী কোরানের কিছু আয়াত লিখে তার সন্তানের গলায় ঝোলাতেন। তবে এটি নবীর নির্দেশনা ছিল না। ইসলামী স্কলারদের মতে, কোরানের আয়াত গলায় ঝুলানো নয়, বরং পড়া, বোঝা ও আমল করার বিষয়।
সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি, যেন মানুষ প্রকৃত ইসলামী রুকাইয়া (Ruqyah) ও কুসংস্কারভিত্তিক ঝাড়ফুঁক (Folk Healing)–এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে এবং ধর্মের নামে প্রতারণা থেকে বাঁচতে পারে।