Sylhet Today 24 PRINT

মাতৃভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল বরাক উপত্যকার শিলচরের বাংলাভাষীরাও

শিলচর ভাষা দিবস

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১৯ মে, ২০২৬

মাতৃভাষা বাংলার অধিকারের জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে একই ভাষার মানুষকে দুটি ভিন্ন ভূখণ্ডে রক্ত দিতে হয়েছিল— এ এক অনন্য ও বিরল ঘটনা। এক ঘটনা ঢাকায় ১৯৫২ সালে, অন্য ঘটনা ভারতের শিলচরে ১৯৬১ সালে।

আজ ১৯ মে। শিলচর ভাষা দিবস; যেদিন বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন ১১ জন। বাঙালির ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক বেদনাভারাক্রান্ত, অথচ গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৬১ সালের এই দিনে ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার শিলচরে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে আন্দোলনে নেমে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন ১১ বাঙালি।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের আত্মত্যাগের ৯ বছর পর, ১৯৬১ সালের ১৯ মে আবারও বাংলার জন্য রক্ত ঝরে। এবার ভারতের আসামে, বরাক উপত্যকার শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে।

১৯৬০ সালের ৩ মার্চ আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা বিধানসভায় অসমিয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা করার ঘোষণা দেন। অথচ বরাক উপত্যকার কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। ফলে এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেন সেখানকার বাঙালিরা।

ঘোষণার পরপরই প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বরাক উপত্যকা। ১৯৬০ সালের ১৬ এপ্রিল শিলচরে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষাভাষীদের নাগরিক সভা। আন্দোলনকে সংগঠিত করতে গঠন করা হয় প্রস্তুতি কমিটি, যার আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক শরৎচন্দ্র নাথ। পরে ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন’ এবং বিভিন্ন সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন আন্দোলনে সমর্থন জানায়।

বাংলাকে অন্যতম সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে সভা, সমাবেশ, ধর্মঘট ও মিছিল ছড়িয়ে পড়ে পুরো বরাক উপত্যকাজুড়ে। আন্দোলন দমনে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, দাঙ্গা, হামলা, অগ্নিসংযোগ ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে টানা ২৯ দিন বরাক উপত্যকার প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালের ১৯ মে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেওয়া হয়। সেদিন শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে রেলপথ অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেন হাজারো আন্দোলনকারী। আন্দোলনকারীরা ছিলেন নিরস্ত্র। কিন্তু সেখানে মোতায়েন করা হয় আসাম রাইফেলসের একটি ব্যাটালিয়ন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে শিলচর রেলস্টেশন ও আশপাশের এলাকা।

পুলিশের গুলিতে শহিদ হন ১১ ভাষাসৈনিক। তারা হলেন কমলা ভট্টাচার্য, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্রচন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর ও সুকমল পুরকায়স্থ। তাদের মধ্যে কমলা ভট্টাচার্যকে পৃথিবীর প্রথম নারী ভাষা শহিদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

গুলিবর্ষণের ঘটনায় আহত হন অর্ধশতাধিক মানুষ। পুরো বরাক উপত্যকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। শিলচর শহরে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। তবে আন্দোলন থেমে থাকেনি। পরদিন ২০ মে হাজারো মানুষ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে শহিদদের মরদেহ নিয়ে বের করেন স্মরণকালের বৃহত্তম শোকমিছিল।

ভাষা আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত অধ্যায় শেষ পর্যন্ত আসাম সরকারকে নতি স্বীকারে বাধ্য করে। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। পরে ভাষার অধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আরও তিনজন আন্দোলনকারী প্রাণ হারান। তারা হলেন বিজন চক্রবর্তী, জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস।

আজও শিলচরের গান্ধিবাগ ও শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহিদদের স্মরণ করেন মানুষ। বরাক উপত্যকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালিরা দিনটি পালন করেন ‘ভাষা শহিদ দিবস’ হিসেবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.