স্পোর্টস ডেস্ক | ১৪ জুলাই, ২০২৬
ফুটবল বিশ্বের সফলতম দলগুলোর অন্যতম স্পেন জাতীয় ফুটবল দল বিশ্বজুড়ে ‘লা রোজা’ নামে পরিচিত।
স্প্যানিশ ভাষায় ‘লা রোজা’ (La Roja) শব্দটির অর্থ ‘লাল’, যা মূলত স্পেনের ঐতিহ্যবাহী লাল জার্সির পরিচায়ক। তবে এই সাধারণ রঙের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ফুটবল রোমাঞ্চ এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অদ্ভুত অধ্যায়।
এই নামকরণের ইতিহাস ঘাঁটতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯২০ সালের অ্যান্টওয়ার্প অলিম্পিকে। ওই আসরেই প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় স্পেন। মাঠের লড়াইয়ে লাল জার্সি ও সাদা প্যান্ট পরে নেমেছিল তারা। টুর্নামেন্টে স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের গতি আর অতি-আক্রমণাত্মক ফুটবল শৈলী দেখে ইতালীয় সংবাদমাধ্যম দলটিকে ‘ফুরিয়া রোজা’ (Furia Roja) বা ‘লাল উন্মাদনা’ নামে আখ্যা দেয়। দীর্ঘকাল ধরে এই নামটিই ছিল স্পেনের ফুটবলের প্রধান সমার্থক।
মাঠের ফুটবল ‘লাল’ রঙকে গৌরবের প্রতীক বানালেও, ১৯৩৬ সালে স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই রঙ এক ভিন্ন অর্থ ধারণ করে। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনামলে ‘লাল’ রঙকে সমাজতান্ত্রিক বা বামপন্থীদের রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। কট্টর ডানপন্থী ফ্রাঙ্কো সরকার তাই জাতীয় দলের জার্সি থেকে লাল রঙ বাদ দিয়ে নীল রঙ ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। প্রায় এক দশক ধরে স্প্যানিশ ফুটবলারদের বাধ্য হয়ে নীল জার্সি পরে মাঠে নামতে হয়েছিল। অবশেষে ফ্রাঙ্কো আমলের শেষের দিকে, ১৯৪৭ সালে স্পেন আবারও তাদের সেই ঐতিহ্যবাহী লাল জার্সিতে ফিরে আসে।
দীর্ঘদিন ধরে ‘ফুরিয়া রোজা’ বা আগ্রাসী লাল নামটি ব্যবহৃত হলেও, ২০০৪ সালে স্পেনের কিংবদন্তি কোচ লুইস আরাগোনেস দায়িত্ব নেওয়ার পর এই নামকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আরাগোনেস চাইলেন মাঠে স্পেনের পরিচয় শুধু ‘আগ্রাসন’ বা ‘উন্মাদনা’ দিয়ে না হয়ে, তাদের নিজস্ব নান্দনিক ফুটবল দর্শনের মাধ্যমে হোক। তিনি ‘ফুরিয়া’ (উন্মাদনা) শব্দটি বাদ দিয়ে কেবল জার্সির রঙকে প্রাধান্য দিয়ে ‘লা রোজা’ নামটি জনপ্রিয় করার ওপর জোর দেন। তার লক্ষ্য ছিল একটি আধুনিক ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলা।
লুইস আরাগোনেসের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই ‘লা রোজা’র দর্শন পূর্ণতা পায় স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের সোনালি প্রজন্মের হাত ধরে। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে স্প্যানিশ ফুটবল দল বিশ্ব ফুটবলে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এই চার বছরে তারা টানা ইউরো ২০০৮, ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ইউরো ২০১২ জয় করে ইতিহাস গড়ে। তিকি-তাকা ফুটবলের জাদুতে বুঁদ হওয়া ফুটবল বিশ্ব তখন থেকেই স্পেনের এই দলটিকে ভালোবেসে ‘লা রোজা’ নামে চিরতরে মনে স্থান দেয়।
আজকের ফুটবল বিশ্বে স্পেনের টিকিটাকা আর শৈল্পিক ফুটবলের রাজত্বের সমার্থক শব্দই হয়ে উঠেছে এই— ‘লা রোজা’।