সিলেটটুডে ডেস্ক | ০৬ অক্টোবর, ২০২৬
প্রতীকী ছবি
স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি, এনআইডি কিংবা ওয়ারিশান সনদ— যেকোনো নাগরিক ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করার প্রাথমিক ভিত্তি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সনদ। অথচ মৌলিক এই রাষ্ট্রীয় সেবাটি পেতেই এখন নাভিশ্বাস উঠছে দেশের সাধারণ মানুষের। টেকনিক্যাল ক্রুটি, সার্ভার ডাউন, ওটিপি না আসা কিংবা সংশোধন জটিলতার কারণে দিনের পর দিন সেবা কার্যালয়গুলোতে ঘুরতে হচ্ছে নাগরিকদের। ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনিক এই স্থবিরতার সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্র।
ভোগান্তির নেপথ্যে প্রশাসনিক রদবদলকেও দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বদলে দায়িত্ব নেন প্রশাসকেরা। অনেক জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক মামলার কারণে এলাকাছাড়া হয়ে পদ হারিয়েছেন। স্থানীয় প্রতিনিধিরা মহল্লা বা এলাকার পরিবারগুলোকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন বলে পরিচয় ও পারিবারিক তথ্য যাচাই বেশ সহজ হতো। বর্তমানে সেই স্থানীয় যোগাযোগের জায়গাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতি সামান্য একটি সনদের জন্যও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
জানা গেছে, জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা হলো সার্ভার ও অনলাইন সেবার জটিলতা। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে গিয়ে অনেক নাগরিককে শুনতে হচ্ছে ‘সার্ভার ডাউন’। আবার অনলাইনে একাধিকবার চেষ্টা করেও ওটিপি না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে একটি সনদের জন্যও বারবার অফিসে যেতে হচ্ছে।
ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে সরকারি দপ্তরের বাইরের কম্পিউটার দোকান কিংবা দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেকেই। আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধনের নিয়ম থাকলেও সচেতনতার অভাব ও প্রাথমিক জটিলতার কারণে তা সময়মতো হচ্ছে না। পরবর্তী সময়ে বয়স বা ভুল তথ্য সংশোধনে গেলে বিপত্তি আরও বাড়ে; বিশেষ করে পিতা-মাতার নিজস্ব নিবন্ধন না থাকলে বা তাঁরা প্রয়াত হলে সন্তানের সনদ নিতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে দেশে এক বছরের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার ছিল যথাক্রমে ৪৯ ও ৪৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে কিছুটা উন্নতি হয়ে তা যথাক্রমে ৬৩ ও ৫৯ শতাংশে পৌঁছালেও ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে জন্মনিবন্ধনের হার আবারও কমে ৪৩ শতাংশে এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সিআরভিএস আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা মেনে ২০৩০ সালের মধ্যে এক বছরের নিচের শিশুদের শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রয়েছে বাংলাদেশের, বর্তমান পরিস্থিতি তার পথকে কঠিন করে তুলছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সিআরভিএস আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে ১০০ শতাংশ নিবন্ধন সম্পন্ন করার আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে।
চলতি বছরের ১৪ জুনের তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে দেশে জন্মনিবন্ধনের জন্য আবেদন পড়েছে ৩৩ হাজার ৭৬৪টি। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৩০২টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন ছিল ৩ হাজার ৬৩৯টি, নিষ্পত্তি হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৪টি। একই দিনে জন্মনিবন্ধন সংশোধনের আবেদন পড়েছে ২৫ হাজার ৯৯১টি, যার মধ্যে ২৩ হাজার ৫৬৯টি নিষ্পত্তি হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তি বেড়েছে। প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থায় জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ ও ট্রেড লাইসেন্সের মতো সেবা নিতে নাগরিকদের দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই সুযোগে কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালাল চক্রের ঘুষ এবং অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া ফাইল না ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে। অধ্যাপক আদিলের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে সেবা দিতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর হটলাইনের পরামর্শ এই পরিকল্পনাবিদের।