আসিফ আযহার | ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদল কর্তৃক জৈন্তিয়ার রাজধানী লুণ্ঠন ও কিশোর বয়সী রাজাকে বন্দী করার কাল্পনিক দৃশ্য। ছবি এআই দিয়ে তৈরি
[বৃটিশরা ভারতবর্ষ দখল করার পরও জৈন্তিয়া ছিল স্বাধীন রাজ্য। তবে মিথ্যে ও চাতুরির আশ্রয় নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে একদিন প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর জৈন্তিয়া রাজ্যও দখল করে নেয় বৃটিশরা। ধারাবাহিকভাবে সে কাহিনী জানাচ্ছেন গবেষক আসিফ আযহার। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।]
১৮৩৫ সালের ১৬ মার্চ। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা স্বাধীন জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজধানীতে এক আকস্মিক অভিযান চালিয়ে সিন্টেং জনগোষ্ঠীর 'সিয়েম' ও জৈন্তিয়া সমতলবাসীর 'রাজা' রাজেন্দ্র সিংহকে বন্দী করে সিলেট শহরে নিয়ে যায়।
এই অভিযানে নিযুক্ত ছিল সিলেট লাইট ইনফ্যানট্রির দুই কোম্পানি সৈন্য। সিলেট লাইট ইনফ্যানট্রির অধিনায়ক কর্নেল লিস্টার নিজে সশরীরে এই অভিযানে অংশ নেননি। তাঁর বদলে এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ছাতকের ইংলিশ কোম্পানির ক্যাপ্টেন হ্যারি ইংলিশ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতা বোর্ডকে না জানিয়েই সিলেট ও ঢাকা কর্তৃপক্ষ এই অভিযানের পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন এবং রাজাকে বন্দী করেছিলেন। শুরু থেকেই এই অভিযানটি ছিল অত্যন্ত রহস্যে ঘেরা!
ওই সময়ে ব্রিটিশদের সাথে জৈন্তিয়ার কোন শত্রুতা ছিল না; দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক ছিল পুরোপুরি স্বাভাবিক। শুধু তাই নয়, ১৮২৪ সালে সম্পাদিত এক চুক্তি (রামসিংহ-ডেভিড স্কট চুক্তি) দ্বারা উভয় পক্ষ পরস্পরের মিত্র হয়েছিল। চুক্তি সম্পাদনের পরে ব্রিটিশরা বর্মীদের সাথে যুদ্ধে জৈন্তিয়ার রাজার সহায়তাও নিয়েছিল। বর্মীদের সাথে যুদ্ধে প্রভূত সাফল্য লাভ করায় পুরো আহোম (আসাম) রাজ্যটি তাদের অধিকারে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আহোম ও সিলেটের মধ্যবর্তী জৈন্তিয়া রাজ্যটি ছিল তখনও স্বাধীন। নিজেদের বিশাল সাম্রাজ্যের মাঝখানে ক্ষুদ্র এই রাজ্যটির স্বাধীনতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্থানীয় (সিলেট ও ঢাকার) কর্তাদের চোখে ভালো ঠেকছিল না!
ক্ষুদ্র এই রাজ্যটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হওয়ায় তারা যেভাবেই হোক রাজ্যটি দখলের কথা ভাবছিলেন। কিন্তু জৈন্তিয়ার রাজা রামসিংহের সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চুক্তি থাকায় তারা কোম্পানির আইন ভেঙ্গে রাজ্যটিতে কোন আগ্রাসন চালাতে পারছিলেন না। অবশেষে ১৮৩২ সালে রামসিংহ মারা গেলে চুক্তিটি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। রামসিংহের উত্তরাধিকারী হিসেবে জৈন্তিয়ার সিংহাসনে বসেছিলেন খুবই অল্পবয়সী একজন রাজা। তাঁর নাম ছিল রাজেন্দ্র সিংহ। তিনি ইন্দ্র সিংহ নামেও পরিচিত ছিলেন। ক্যাপ্টেন হ্যারি ইংলিশ এই বালক বয়সী রাজার সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলেছিলেন। রাজার কাছ থেকে তিনি জৈন্তিয়ার চুনাপাথর উত্তোলনের অনুমতিও আদায় করে নিয়েছিলেন।
হ্যারি ইংলিশ জৈন্তিয়ার রাজধানীতে প্রায়ই যাতায়াত করতেন। রাজার সাথে ঘনিষ্ঠতার সুবাধে রাজ্যের সর্বত্র তাঁর এবং তাঁর লোকজনের আনাগোনা ছিল। জৈন্তিয়াবাসী জানত, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে জৈন্তিয়ার সন্ধিচুক্তি আছে এবং হ্যারি ইংলিশ রাজার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু! তাই হ্যারি ইংলিশকে নিয়ে কারও কোন সন্দেহ ছিল না। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখা গেল, হ্যারি ইংলিশ সিলেট লাইট ইনফ্যানট্রির দুই কোম্পানি সৈন্য নিয়ে জৈন্তিয়ার রাজধানী নিজপাটে প্রবেশ করছেন। দিনটি ছিল ১৮৩৫ সালের ১৬ মার্চ। ক্যাপ্টেন হ্যারি ইংলিশ সেদিন প্রচুর সৈন্য নিয়ে নিজপাটে আগমণ করলেও রাজা তাকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
ইতোপূর্বে হ্যারি ইংলিশ রাজার কাছে খবর পাঠিয়েছিলেন যে, তিনি বেড়ানোর উদ্দেশ্যে এবং রাজার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নিজপাটে আসছেন। অনভিজ্ঞ রাজা সরলমনে এটি বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি কোন আগাম প্রতিরোধের ব্যবস্থাই করেননি। এর ফলে দেখা গেল, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হ্যারির অনুগত কোম্পানি সৈন্যরা নিজপাট দখল করে নিয়েছে। রাজাও তাদের হাতে বন্দী হয়ে গেলেন। এরপর তারা হতবিহ্বল রাজাকে (বন্দী অবস্থায়) নিয়ে সিলেটের পথে রওনা হয়। সেই মুহুর্তে হাজার হাজার জৈন্তিয়াবাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রাণ দেওয়ার জন্য রাজার অনুমতি চাইল।
কিন্তু বিপুল প্রাণহানি এড়াতে রাজা সেই অনুমতি দিলেন না। তিনি নিজের দূর্ভাগ্য ও পরাজয়কেই মেনে নিলেন। রাজা বাকি জীবন সিলেট শহরের উপকন্ঠে জমিদার মুরারী চাঁদের বাড়িতে গৃহবন্দী অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। ১৮৬১ সালে তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। জৈন্তিয়ার সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সন্ধিচুক্তি ভঙ্গের এই নজিরবিহীন প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনাটি আজও 'নরবলী' নামক এক আষাঢ়ে গল্পের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিলেটস্থ কর্তারা জৈন্তিয়া দখলের ঘটনাটিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য 'জৈন্তিয়ার রাজা কর্তৃক কোম্পানির প্রজা বলীর' একটি আষাঢ়ে গল্প তৈরী করেছিলেন।
ইতিহাসবিদ সৈয়দ মুর্তাজা আলী লিখেছেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরগণ রামসিংহ-ডেভিড স্কট চুক্তির এমন বরখেলাপ পছন্দ করেননি। কোম্পানির স্থানীয় কর্তারা তখন রাজ্যটি দখলের পেছনে একটি মিথ্যা অজুহাতকে সামনে নিয়ে আসেন। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, তারা নন, জৈন্তিয়ার রাজাই আগে চুক্তিটি ভেঙ্গেছেন! এটি প্রমাণ করার জন্য তারা একটি পুরানো ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসেন। ঘটনাটি হল, ১৮৩২ সালে সংঘটিত একটি ঘটনা। ওই বছর জৈন্তিয়ার অনুগত রাজ্য গোভার কিছু দুষ্কৃতিকারী কোম্পানি এলাকার (আহোমের) তিনজন লোককে ধরে এনে বলী দেয়। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জৈন্তিয়ার রাজার কোন যোগসূত্র ছিল না।
সৈয়দ মুর্তাজা আলী লিখেছেন, এ ঘটনার প্রেক্ষিতে জৈন্তিয়ার রাজা চারজন অপরাধীকে গ্রেফপ্তার করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের হাতে তোলে দিয়েছিলেন। বিষয়টি এখানেই নিষ্পত্তি লাভ করেছিল। কিন্তু জৈন্তিয়া দখলের পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্থানীয় কর্তারা ওই ঘটনাটিকেই জৈন্তিয়া দখলের অজুহাত হিসেবে হাজির করেন! তারা ওই ঘটনায় জৈন্তিয়ার রাজার সম্পৃক্ততা ছিল বলে দাবি করেন এবং এর ফলে জৈন্তিয়ার সাথে কোম্পানির চুক্তিও ভেস্তে গিয়েছিল বলে ব্যাখ্যা দেন। এভাবে তারা জৈন্তিয়া দখলের ঘটনাটিকে কোম্পানির আইনে বৈধ বানিয়ে নেন! জবরদখলের ঘটনাটির বৈধতা আদায়ের জন্য জৈন্তিয়ার রাজার বিরুদ্ধে তারা যে নরবলীর অভিযোগ এনেছিলেন সেটি বিভিন্ন ব্রিটিশ দলিলপত্রে লিপিবদ্ধ হলেও পরবর্তীতে ইতিহাস গবেষকদের অনুসন্ধানে তা একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
অচ্যুতচরণ চৌধুরী, মোহাম্মদ আবদুল আজিজ এবং সৈয়দ মুর্তাজা আলী 'জৈন্তিয়ার রাজা কর্তৃক নরবলী প্রদানের' অভিযোগটিকে পুরোপুরি অসার ও ভিত্তিহীন বলে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যান্য ঐতিহাসিকরাও একই মত দিয়েছেন। সকল ঐতিহাসিকই এ ব্যাপারে একমত যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তারা জৈন্তিয়ার সম্পদের লোভেই রাজ্যটি দখল করেছিলেন, অন্য কোন কারণে নয়।
[জৈন্তিয়ার সাথে ব্রিটিশরা কেন মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেছিল, ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধে এই চুক্তির কী প্রভাব ছিল এবং যুদ্ধজয়ের পরে ব্রিটিশরা কেন এই চুক্তি লংঘন করে জৈন্তিয়া দখল করে নিয়েছিল তার বিস্তারিত ইতিহাস জানতে পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে চোখ রাখুন।]