Sylhet Today 24 PRINT

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি

সিলেটটুডে ডেস্ক  |  ০৮ এপ্রিল, ২০২৬

আগের দিনই যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়েছিলেন, তেহরান সমঝোতায় না এলে এক রাতেই ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংস করার। তবে এমন হুমকি দেওয়ার কয়েক ঘন্টা পরই পরিকল্পিত হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দিলেন তিনি।

ইরানকে বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টারও কম সময়ের আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, তিনি আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।

ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে রাজি হওয়ায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ইরানও এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।

একমাসের অধিক সময় ধরে দুই দেশের চলমান এই যুদ্ধ, যা ছড়িয়ে পড়েছিলো পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আর প্রভাব পড়েছিলো বিশ্বজুড়ে, সেই যুদ্ধ স্থগিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিলো পাকিস্তান।

মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ভাই’ সম্বোধন করে ‘অক্লান্ত পরিশ্রমের’ জন্য তাদের গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরাগচির সেই বার্তাটি নিজের মালিকানাধীন ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ শেয়ার করেছেন, যা শান্তি আলোচনায় ইসলামাবাদের ভূমিকার প্রতি ওয়াশিংটনের সম্মতিরই ইঙ্গিত দেয়।

এর পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, ‘অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমি ঘোষণা করছি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিয়ে লেবাননসহ সব জায়গায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা এখনই কার্যকর হবে।’

শাহবাজ শরিফ এই দূরদর্শী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের দেশের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চূড়ান্ত আলোচনার লক্ষ্যে ১০ এপ্রিল (শুক্রবার) উভয় দেশের প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানান। শরিফ আশা প্রকাশ করেন, ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ টেকসই শান্তি অর্জনে সফল হবে।

তবে এই সমঝোতায় মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তানকে কৃতিত্ব দিলেও সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, এই যুদ্ধবিরতির জন্য শর্ত প্রযোজ্য, বিশেষ করে ইরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে হবে।

ট্রাম্প লিখেছেন, “পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনায় তারা যেহেতু আজ রাতে ইরানের ওপর ধ্বংসাত্মক হামলা না করার অনুরোধ জানালেন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যেহেতু হরমুজ প্রণালিকে অবিলম্বে সম্পূর্ণ ও নিরাপদভাবে খুলতে সম্মত হওয়ার শর্তে সম্মত হয়েছে, আমি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের ওপর বোমা হামলা ও আক্রমণ স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছি।

ট্রাম্পের বার্তার কিছুক্ষণ পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানো গেছে।

তিনি বলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ হলে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীও তাদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ করবে।”

আরাকচি আরও বলেন, “ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত সম্ভব হবে।”

যুক্তরাষ্ট্রের হামলা স্থগিতের আহ্বান জানাতে শেষ মুহূর্তে ভূমিকা রাখায় পাকিস্তানকেও ধন্যবাদ জানান আরাগচি।

অন্যদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল পৃথক বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছে, আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হলে এই যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ানোও হতে পারে।

ইরান জানিয়েছে, শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হতে পারে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছেন।

রয়টার্স জানিয়েছে, ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনা হবে কি না, যুক্তরাষ্ট্র এখনও তা নিশ্চিত করেনি তবে এগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাব আলোচনার জন্য একটি ‘কার্যকর ভিত্তি’ আর দুই সপ্তাহের এই পরিসরে একটি চুক্তি ‘চূড়ান্ত ও সম্পন্ন করা যাবে’ বলে আশা করছেন তিনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল মুনির রাতভর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।


পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা

যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আজ রাতে পুরো সভ্যতা মারা যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ তাহলে ওয়াশিংটন ও তেহরান কীভাবে একমত হলো? এর উত্তর হলো, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল মুনিরের দক্ষ কূটনীতি।

ইসলামাবাদ মার্চ মাসের শেষ দিক থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তির জন্য চেষ্টা করছিল। গত ২৯ মার্চ তারা তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে একটি বৈঠক করে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যখন দুই পক্ষই একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছিল, তখন পাকিস্তান নেপথ্য আলোচনার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফার প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দেয় এবং পরে ইরানের জবাব ওয়াশিংটনকে জানায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেন ইসলামাবাদকে বিশ্বাস করে

মধ্যস্থতাকারী হতে হলে দুই পক্ষেরই আস্থা থাকা জরুরি। আরবের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পর্কের কারণে ইরান তাদের আর বিশ্বাস করছে না। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় কিছু দেশে হামলাও চালিয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে।

দেশ দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান, যা আরাগচির ‘প্রিয় ভাই’ সম্বোধন থেকেই স্পষ্ট। এ ছাড়া ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, যা ইরানের আস্থার একটি বড় কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও গত এক বছরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বেশ উন্নতি হয়েছে। ইসলামাবাদ ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়েছে, যা গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে আসিম মুনিরকে তাঁর ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মুনিরের সঙ্গে মার্কিন ও ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের গভীর যোগাযোগ থাকায় পাকিস্তান এই আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।

পাকিস্তানের কেন এ যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন

পাকিস্তানের এই আগ্রহ কেবল ভূরাজনৈতিক নয়; বরং জীবন-মরণ সমস্যা। দেশটি তার অধিকাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে পায়। তা ছাড়া বহু পাকিস্তানি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজ করে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) পাঠান। যুদ্ধের ফলে এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল, যা শাহবাজ সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছিল।

এ ছাড়া পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে বিরোধ তো আছেই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এমনিতেই উত্তপ্ত। এর মধ্যে অন্য প্রতিবেশী ইরানের অস্থিরতা পাকিস্তানের জন্য মোটেও সুখকর নয়। দেশের ভেতরেও স্থিতিশীলতার সংকট ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এবং বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান।


মঙ্গলবার সারাদিন ধরে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল তার থেকে পুরোপুরি আকস্মিক এক পরিবর্তন ছিল ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা। এর আগে তিনি তার দাবি না মানলে এক রাতের মধ্যেই ‘একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস’ দেওয়ার ভয়াবহ হুমকি দিয়েছিলেন।

তার এই হুমকিতে বিশ্ব নেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন আর তা ব্যাপক সমালোচনা কুড়িয়েছিল।

সব মিলিয়ে, আপাতদৃষ্টিতে যুদ্ধবিরতির এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক অগ্রগতি হলেও, এর কার্যকারিতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণের ওপর। একই সঙ্গে, ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত আলোচনাই নির্ধারণ করবে এই সাময়িক বিরতি শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তিতে রূপ নেয় কি না।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.