Sylhet Today 24 PRINT

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়, দিদির বিদায়

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০৪ মে, ২০২৬

গত বছরের নভেম্বর মাসে বিহারে এনডিএ জোটের বড় জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘বিহার হয়েই গঙ্গা নদী বাংলায় প্রবাহিত হয়’। এই রূপকটিই ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সুর বেঁধে দিয়েছিল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল।

পাঁচ মাস পর, অবশেষে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত এই পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যটি দখল করল বিজেপি। দলটি এখন ২০০টি আসনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) দুই অঙ্কের ঘরে নেমে গিয়ে বেশ পেছনে পড়ে রয়েছে। এই ফলাফল বিজেপির জন্য এক ঐতিহাসিক বিজয় এবং তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে।

বুথফেরত জরিপগুলো আগেই বিজেপিকে এগিয়ে রেখেছিল। পাঁচটি জরিপ সংস্থা গেরুয়া শিবিরকে ১৪৬ থেকে ১৯২টি আসন দিয়েছিল। অন্যদিকে, দুটি সংস্থা মমতার ফেরার পূর্বাভাস দিয়ে তৃণমূলকে ১৭৭ থেকে ২০৫টি আসন দিয়েছিল। মমতা অবশ্য এক্সিট পোলগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছিলেন, তৃণমূল ২২০টিরও বেশি আসন জিতবে। তার দলের নেতারাও ২০২১ সালের উদাহরণ টেনে একই আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছিলেন, যখন মমতা সব পূর্বাভাস চুরমার করে দিয়েছিলেন।


তবে এবার বুথফেরত জরিপের সংখ্যাগুলোই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে লিখেছে, এই নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তরবঙ্গে বিজেপি বেশ এগিয়ে রয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলটির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এবার দলটি তৃণমূলের বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ঘাঁটিতেও বড় ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। মেদিনীপুরে বিজেপি আদিবাসী ভোট পেয়েছে। এছাড়া তৃণমূলের আরেক দুর্গ বর্ধমানেও গেরুয়া ঝড় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে কলকাতা এবং হাওড়ার মতো প্রধান শহুরে এলাকাগুলো তৃণমূলের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে এবং নির্বাচনকে বিজেপির পক্ষে নিয়ে গেছে। প্রেসিডেন্সি অঞ্চলেও গেরুয়া ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। মালদহে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ কার্যক্রম স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)-এর পর ব্যাপক ভোটার বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে তৃণমূল কোনোমতে সামান্য ব্যবধানে টিকে রয়েছে। তবে দক্ষিণ কলকাতার মমতার নিজের দুর্গ ভবানীপুরে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী ১০ রাউন্ডেরও বেশি গণনা বাকি থাকতেই ১৭ হাজারেরও বেশি ভোটে সুবিধাজনক অবস্থানে এগিয়ে রয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গের এই লড়াই নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য রবিবার ইন্ডিয়া টুডে ইন-কে দেওয়া এক ফোনালাপে বলেছিলেন, এটি ছিল একটি বর্জনের নির্বাচন। তিনি বলেছিলেন, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে বেকারত্ব, সব বিষয়ই তৃণমূলের পতনে ভূমিকা রাখছে।

প্রতাপশালী বামপন্থিদের বিরুদ্ধে বাঘিনীর মতো রুখে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটানো এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে অন্যতম সম্ভাব্য মুখ হয়ে ওঠা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উত্থান এক ইতিহাস। তবে তার ১৫ বছরের শাসনকাল দুর্নীতি ও গুন্ডারাজ সংস্কৃতির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রচারণা মূলত মানুষের ভেতরের এক বড় ভয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, যা কলকাতার আর জি করের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরও তীব্র রূপ নিয়েছিল।

এর পাশাপাশি মমতার বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণের অভিযোগ তুলেছিল বিজেপি, যা দলটির দাবি অনুযায়ী বাংলার হিন্দুদের ক্ষতিগ্রস্ত করছিল। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ স্লোগানের ওপর ভর করে সাংস্কৃতিক অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিল। তারা এই প্রচারণাও চালিয়েছিল যে বিজেপি জিতলে মাছসহ অন্যান্য আমিষ খাবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। এই প্রচারণার জবাব দিতে গেরুয়া শিবিরের নেতারা বাংলায় এসে ক্যামেরার সামনে মাছ খেয়ে দেখান।

তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে এবার বাংলার মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, খাবার এবং চিরাচরিত ‘চা-আড্ডা’কে প্রাধান্য দেওয়া এই রাজ্যটি এবার পরিবর্তন চেয়েছে। বিজেপির দাবি, বেকারত্ব, ভয়ভীতি প্রদর্শন, গুন্ডারাজ ও দুর্নীতির কারণেই মানুষ তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। যেখানে তৃণমূলের মূল বক্তব্য ছিল যে বিজেপি জিতলে বাংলার ওপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তারা বাঙালি পরিচয় ও সংস্কৃতিকেই তুলে ধরেছিল।

যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও আশাবাদী। একটি ভিডিও বার্তায় তিনি তৃণমূল কর্মীদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এখনও অনেক রাউন্ডের ভোট গণনা বাকি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘হতাশ হবেন না’।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.