Sylhet Today 24 PRINT

যেসব কারণে মমতার দূর্গে ফুটল পদ্মফুল

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০৪ মে, ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ধারণার চেয়েও বড় জয় পেতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সোমবার (৪ মে) সন্ধ্যা ২টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে তারা প্রায় ২০০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এর আগে দলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে ১৮৫-এর বেশি আসন পাওয়ার অনুমান করা হয়েছিল, কিন্তু ফল সেই পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বিজেপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো এই অভাবনীয় জয়ের পেছনে প্রধানত ৫টি কারণ চিহ্নিত করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ১৫ বছরের শাসনামলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তথা ‘নিরাপত্তা’র মতো মূল বিষয় থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) ও পেনশন এবং কেন্দ্রের উন্নয়ন; সব মিলিয়ে দলটির জয়ের পেছনে যে পাঁচটি কারণ তুলে এনেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।


নারী ভোটারদের সমর্থন

গত মাসে কেন্দ্রীয় আইনসভায় নারী সংরক্ষণ বিল পাসের মাধ্যমে এনডিএ সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা বিজেপির পালে হাওয়া দিয়েছে। বিজেপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়, বিরোধী দলগুলো নারীবিরোধী এমন একটি বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

দলের সূত্রগুলো বলছে, তারা এখনও এর প্রভাব মূল্যায়ন করছেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, রাজ্যে নারী ভোটারদের অন্তত ৫ শতাংশ ভোট এবার সরাসরি বিজেপির পক্ষে গেছে।

উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে পুরুষ ও নারী ভোটারের অনুপাত প্রায় সমান। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার পর সংশোধিত ভোটার তালিকায় মোট ৬ কোটি ৪৪ লাখ ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার ৩ কোটি ১৬ লাখ এবং পুরুষ ভোটার ৩ কোটি ২৮ লাখ। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনে নারী-পুরুষ ভোটার ছিল যথাক্রমে ৩ কোটি ৫৯ লাখ এবং ৩ কোটি ৭৪ লাখ। সে বছর তৃণমূল ৪৮.০২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, আর বিজেপি পেয়েছিল ৩৮.১ শতাংশ এবং কংগ্রেস ১০ শতাংশ ভোট।

সরকারি কর্মচারীদের মন জয়

দিল্লির মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি কর্মচারী রয়েছেন। দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব, সরকারি কর্মচারীদের ‘অধিকার খর্ব’ হওয়া এবং সপ্তম পে-কমিশন চালুর প্রতিশ্রুতি প্রায় ২০ থেকে ৫০ লাখ ভোটারের মধ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি সরকারি চাকরি প্রত্যাশী তরুণ ভোটাররাও ছিলেন।

নির্বাচনি প্রচারণায় ‘পরিবর্তন যাত্রা’র সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যেই রাজ্যে সপ্তম পে-কমিশন কার্যকর করা হবে এবং সরকারি চাকরির শূন্য পদগুলো পূরণ করা হবে।

উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্যান্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে সার্ভিস ভোটারের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি (১ লাখ ৮ হাজার)। যেখানে তামিলনাড়ুতে ছিল ৬৭ হাজারের কিছু বেশি, আসামে ৬৩ হাজার এবং কেরালায় ৫৪ হাজারের কিছু বেশি।

কেন্দ্রের নেতৃত্বে উন্নয়ন

বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়ন না করা এবং তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যে সরকারি ও শিল্প অবকাঠামোর অভাবের কারণে ‘নরেন্দ্র মোদি বনাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’ লড়াইয়ের এই কৌশল বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে। ২০২৫ সালে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বিরুদ্ধেও বিজেপির এই একই কৌশল ছিল।

বিজেপি শিবিরের মতে, কেন্দ্রের উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি এবং রাজ্যের এক ডজনেরও বেশি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মোদির দেওয়া আশ্বাস মধ্যবিত্ত ও প্রথমবার ভোট দেওয়া তরুণদের আকৃষ্ট করেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার ভোটার তালিকায় ৫ লাখ ২৩ হাজার প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটার এবং ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ ভোটার ছিলেন। এই তরুণ সমাজকে লক্ষ্য করে বিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠ পর্যায়ে বিশেষ প্রচার অভিযান চালিয়েছিল।

নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া

নির্বাচনি সহিংসতার জন্য পরিচিত এই রাজ্যে আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) তাদের আদর্শের বাইরে গিয়েও সাধারণ ভোটারদের সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে সাধারণ ভোটাররা কোনও ভয়ভীতি ছাড়াই তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সাহস পেয়েছেন। এর পাশাপাশি রাজ্যে নজিরবিহীনভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সিএপিএফের (সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেস) ৫০০ কোম্পানি পশ্চিমবঙ্গে মোতায়েন থাকবে। এর আগে ইভিএম, স্ট্রং রুম ও গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য আরও ২০০ কোম্পানি সিএপিএফ মোতায়েন রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আশ্বাস এবং আর জি করের মতো ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৃণমূলকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

এসআইআর ও বহিরাগত বিতর্ক

বিজেপির ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ কার্যক্রম (এসআইআর) এবার বড় ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে কোনও ভুয়া ভোটার নয়, কেবল ‘প্রকৃত ভোটাররাই’ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন।

এর পাশাপাশি বিজেপি ভোটার তালিকা থেকে ‘বহিরাগত’দের বাদ দেওয়ার প্রচারণা চালিয়েছিল। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতির নতুন মানদণ্ডের কারণে রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে ২৭ লাখেরও বেশি নাম বাদ পড়েছিল। এর ফলে ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার ৩০ লাখেরও বেশি ভোট পড়েছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.