সিলেটটুডে ডেস্ক | ০৮ অক্টোবর, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি কাগান এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই। জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অরৈখিক প্রভাব এবং অসমমিত সংশ্লেষণে স্বয়ংক্রিয় অনুঘটন প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে ৪টার দিকে রসায়নে নোবেলজয়ী এই দুই বিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করা হয়। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাদের নাম ঘোষণা করে।
অ্যামাইনো অ্যাসিডের মতো কিছু অণু দুটি ভিন্ন রূপে থাকতে পারে। এই দুটি রূপ একে অন্যের আয়না প্রতিবিম্ব। কিন্তু জীবদেহে সাধারণত এই দুই রূপের মধ্যে একটি রূপই দেখা যায়। রাসায়নিকভাবে একই ধরনের হলেও তাদের গঠন একে অপরের বিপরীত।
কেন জীবদেহে একটি নির্দিষ্ট আয়না রূপই প্রাধান্য পায়, তা দীর্ঘদিন ধরে রসায়নবিদদের কাছে রহস্য ছিল। এই রহস্যের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যই এ বছর হেনরি কাগান ও কেনসো সোয়াইকে রসায়নে নোবেল দেওয়া হয়েছে।
জীবনের এই বিশেষ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যকে রসায়নবিদরা ‘হোমোকাইরালিটি’ বলেন। শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘একই’ ও ‘হাত’ শব্দ থেকে। মানুষের দুই হাত যেমন একে অপরের আয়না প্রতিবিম্ব, তেমনি কিছু অণুরও দুটি আয়না রূপ থাকে।
অ্যামাইনো অ্যাসিডের ক্ষেত্রে এমন দুটি রূপ তৈরি হতে পারে। কিন্তু জীবদেহের কোষে প্রোটিন তৈরিতে সাধারণত এর একটি রূপই ব্যবহৃত হয়। অন্য রূপটি প্রকৃতিতে খুব একটা দেখা যায় না।
হোমোকাইরালিটি কীভাবে তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে রসায়নবিদরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন। এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে দুটি আয়না রূপের অণু তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দুই রূপ প্রায় সমান পরিমাণে তৈরি হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট আয়না রূপকে আলাদা করে তৈরি করা কঠিন ছিল।
বিশেষ করে ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবন্ত প্রাণীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করবে এমন অণুর ক্ষেত্রে অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট আয়না রূপই কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়। অন্য রূপটি একইভাবে কাজ নাও করতে পারে।
এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে হেনরি কাগানের গবেষণায়। ১৯৮৬ সালে তিনি রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন পদ্ধতি দেখান। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট আয়না রূপ তৈরির ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ পাওয়া সম্ভব হয়।
কাগানের এই কাজ অসমমিত সংশ্লেষণের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। আগে যেখানে দুটি আয়না রূপ প্রায় সমানভাবে তৈরি হতো, সেখানে নির্দিষ্ট একটি রূপকে বেশি পরিমাণে তৈরি করার পথ খুলে যায়।
এরপর এই গবেষণায় আরও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আনেন কেনসো সোয়াই। ১৯৯৫ সালে একটি জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা তুলে ধরেন, যা সম্ভাব্যভাবে হোমোকাইরাল রূপ তৈরি করতে পারে।
তবে এখানেই তার গবেষণা থেমে থাকেনি। ২০০৩ সালে তিনি আরও বড় সাফল্য অর্জন করেন। তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া দেখান, যেখানে সম্ভাব্য একটি আয়না রূপই তৈরি হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
জীবের সাহায্য ছাড়াই এমন রাসায়নিক প্রক্রিয়া দেখানো এর আগে সম্ভব হয়নি। ফলে হোমোকাইরাল রাসায়নিক বিক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে সোয়াইয়ের কাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার মূলত এমন আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা রসায়নবিদদের নির্দিষ্ট আয়না রূপের অণু তৈরি করার রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিচালনার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এর ফলে ওষুধসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ তৈরিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন ও ওমর এম ইয়াগি। ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক’ উদ্ভাবনের জন্য তাদের ওই পুরস্কার দেওয়া হয়।
এখন পর্যন্ত রসায়নে ১১৭ বার নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এই বিভাগে সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে জন বি গুডএনাফের। ২০১৯ সালে ৯৭ বছর বয়সে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।
অন্যদিকে, ৩৫ বছর বয়সে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ফ্রেদেরিক জোলিও কুরি এই বিভাগের সবচেয়ে কম বয়সী বিজয়ীদের একজন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১৯৮ জন ব্যক্তি রসায়নে এ পুরস্কার পেয়েছেন।