সিলেটটুডে ডেস্ক | ৩১ আগস্ট, ২০১৯
বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল আসামের সব ফরেনার্স ডিটেনশন ক্যাম্প (বিদেশি বন্দিশালা) গুঁড়িয়ে দেবে। সাধারণ নির্বাচনের আগে আসামের শিলচরে নির্বাচনী জনসভায় খোদ প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া এই আশ্বাসের ঠিক উল্টোটাই এখন ঘটছে। নতুন করে গড়া হচ্ছে ‘বিদেশিদের বন্দিশালা’।
আসাম সরকারের বিদেশি ট্রাইব্যুনালে শনাক্ত হওয়া বিদেশি নাগরিকদের জন্য রাজ্যে ছয়টি বন্দিশালা রয়েছে। জেলা কারাগারের ভেতর এসব বন্দিশালায় বিদেশিদের রাখা হয়। এদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি। মোদি সরকার এর জন্য খরচ করছে ৪৬ কোটি রুপি। আসাম সরকার এর মধ্যে গোয়ালপাড়ার ডাকুরভিটায় ২০ বিঘা জমি বরাদ্দ করেছে।
আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি চূড়ান্ত হচ্ছে ৩১ আগস্ট। এই তালিকা থেকে বাদ পড়বে অন্তত ৪০ লাখ মানুষ। এরা পর্যায়ক্রমে ভারতের নাগরিকত্ব হারাবে। রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া এ মানুষগুলোকে বন্দিশালায় রাখা হবে। বাদপড়াদের খসড়া তালিকায় যাদের নাম উঠেছে তাদের সবাই বাঙালি। তালিকায় নাম থাকাদের বেশিরভাগই মুসলিম। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীও রয়েছেন অনেক। আসামজুড়ে ছয়টি কারাগারকে বন্দিশালায় রূপান্তর করা হয়েছে। তড়িঘড়ি করে আরও ১০টি বন্দিশালা নির্মাণের তোড়জোড় চলছে এখন। শুক্রবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে সে ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।
উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার পরই ভারত থেকে 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী'দের বের করে দেওয়ার কথা জানায়। দলটির নজর পড়ে আসামে। বিজেপি প্রচার করে, বাংলাদেশ থেকে 'অবৈধ'ভাবে বাংলাদেশের নাগরিকরা আসামে 'অনুপ্রবেশ' করেছে। ২০১৬ সালে রাজ্যটিতে বিজেপি জোট সরকার গড়ে আসাম গণপরিষদ ও বোডোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্টের সঙ্গে। উগ্র আসামীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার কারণে বিজেপির 'অনুপ্রবেশ তত্ত্বে' জোর হাওয়া লাগে। ১৯৮০-এর দশক থেকে বাঙালি 'অনুপ্রবেশে'র বিষয়ে সরব আসাম গণপরিষদ। এর ফলে আসামে এনআরসির সিদ্ধান্ত হয়। গত চার বছর ধরে সেখানকার বাঙালিরা নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন। অথচ তাদের চৌদ্দপুরুষের বাস আসামেই।
এনআরসিকে কেন্দ্র করে আসামের রাজধানী গৌহাটিতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে আগেই। গতকাল আসামজুড়েই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ৬০ হাজার রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি ১৯ হাজার আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আজ যারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বেন, তাদের ঢোকানো হবে বন্দিশালায়। এরই মধ্যে আসামে এমন ছয়টি বন্দিশালা আছে। গোয়ালপারা, ধুবড়িগড়, জোরহাট, শিলচর, কোকড়াঝড় এবং তেজপুর জেলায় জেলগুলোকে বানানো হয়েছে বন্দিশালা। এসব এলাকায় বাঙালিদের বসবাসও বেশি। আরও ১০টি বন্দিশালা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে সেগুলোর কাজও শুরু হয়ে গেছে। আগের ছয়টির মতোই এই বন্দিশালাগুলো প্রস্তুত হচ্ছে বারপেটা, দিমা হাসাও, কামরূপ, করিমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নওগাঁ, নালবাড়ি, শিবসাগর, সোনিতপুর জেলায়।
এসব বন্দিশালায় কত মানুষকে রাখা যাবে? ধরা যাক, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার। বাকিরা তাহলে কোথায় যাবেন? সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, আসামের এসব বন্দিশালায় কাউকে তিন বছরের বেশি আটকে রাখা যাবে না। তারপর তারা কোথায় যাবেন? এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই।
বারপেটার শিক্ষক সাহিবুল সিকদারের পরিবার ১৯৩৮ সাল থেকে আসামে বসবাস করে আসছে। এনআরসির খসড়া তালিকায় তার বাবা, ভাই, বোনদের নাম এসেছে। কিন্তু তার নামটি বাদ পড়ে গেছে। সাহিবুল জানান, 'নিজ দেশে অনুপ্রবেশকারী হয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?' সাহিবুলের চোখে ঘুম নেই। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বন্দিশালায় যাওয়ার কথা মনে হলেই চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। সাহিবুল একা নন, তার মতো এমন লাখ লাখ বাঙালি রাষ্ট্রহীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়।