আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
চীনের উহান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী ভাইরাসটির ক্রমেই মহামারীর মতো রূপ নিচ্ছে। চীনে আগের তুলনায় প্রতিদিন মৃতের সংখ্যাও বেড়ে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু করে এ মাসের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিনই ২০ থেকে ৩০ জন করে মারা গেছেন। তবে গত দুদিনের এই সংখ্যাটাও বেড়েছে। গত দুদিনে অন্তত ১৩০ জনের মতো মৃতের খবর পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচশ ছুঁইছুঁই করছে। এদিকে চীনের বাইরেও হংকং ও ফিলিপাইনে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
হাজার হাজার মানুষকে আক্রান্ত করেছে এটি, বন্ধ হয়েছে সীমান্ত আর এর কারণেই চীনের একাংশ হয়ে পড়েছে অচল। সারাবিশ্বে নাড়িয়ে তোলা এই ভাইরাসটির নাম নিয়ে নানারকম দ্বিধা রয়েছে। ভাইরাসটিকে প্রথম থেকে ‘করোনাভাইরাস’ বলে উল্লেখ করা হলেও এটা তার প্রকৃত নাম নয়। মূলত এটা ভাইরাসের যে গ্রুপ বা দলে এটির অবস্থান সেটির নাম করোনাভাইরাস। পরে অনেকেই এটিকে ‘নতুন করোনাভাইরাস’ বলে উল্লেখ করেছেন। আবার এটির সাময়িক একটা নামও দেয়া হয়েছিল ২০১৯-এনকভ হিসেবে। কিন্তু বলার ক্ষেত্রে এটা খুব একটা সহজ নয়।
বিজ্ঞানীরা এর প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে এর একটি উপযুক্ত নাম ঠিক করারও চেষ্টা করেছেন বেশ কয়েকটি বৈঠকে। সেই বিজ্ঞানীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি বলছে, খুব শিগগিরই ভাইরাসটির প্রকৃত নাম ঘোষণা করতে যাচ্ছেন তারা।
জনস হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির সহকারী অধ্যাপক এবং সিনিয়র স্কলার ক্রিস্টাল ওয়াটসন বিবিসিকে বলেছেন, ‘নতুন কোন ভাইরাসের নামকরণ সাধারণত কিছুটা দেরিতে হয় এবং জনস্বাস্থ্যের উপর এটি কী ধরণের প্রভাব ফেলে তার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়, যা যুক্তিসম্মত। কিন্তু নামকরণকেও অগ্রাধিকার দেয়ার কারণ রয়েছে।’
তিনি বলেন, নতুন এই ভাইরাসকে চিহ্নিত করতে বিজ্ঞানীরা একে নোভেল বা নতুন করোনাভাইরাস নামে ডাকছেন। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে দেখলে মুকুটের মতো স্পাইক বা কাটা থাকে বলে এদের করোনাভাইরাস নামকরণ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) একে প্রাথমিকভাবে ২০১৯-এনকভ নামে ডাকার সুপারিশ করেছে- যার মধ্যে এটি কোন সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল অর্থাৎ ২০১৯ এবং ‘এন’ দিয়ে নোভেল বা নিউ বা নতুন বোঝায় এবং ‘কভ’ দিয়ে করোনাভাইরাস বোঝায়। তবে এটাই চূড়ান্ত নয়।
ডা. ওয়াটসন বলেন, ‘বর্তমানে এটির যে নাম আছে তা ব্যবহার সহজ নয় এবং জনগণ এবং মিডিয়া এর অন্য নাম ব্যবহার করছে। আনুষ্ঠানিক নাম না থাকার সমস্যা হচ্ছে মানুষ এটাকে চায়না ভাইরাস বলে ডাকতে শুরু করে, আর এটা নির্দিষ্ট জনগণের জন্য নেতিবাচক হতে পারে।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনানুষ্ঠানিক নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা আর পরিবর্তন করাটা কঠিন হয়ে পড়ে, তিনি বলেন।
জরুরিভিত্তিতে ভাইরাসটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করার দায়িত্ব ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন ট্যাক্সোনমি অব ভাইরাসেস-আইসিটিভি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। তাদের ভুলেই ২০০৯ সালে এইচওয়ানএনওয়ান ভাইরাসের নাম দেয়া হয়েছিল ‘সোয়াইন ফ্লু’। এর কারণে মিশর তাদের সব শুকর মেরে ফেলেছিল, যদিও ভাইরাসটি শুকরের মাধ্যমে নয় বরং মানুষের মাধ্যমে ছড়ায়। এজন্য এবারের নামকরণ নিয়ে সতর্ক থাকছে প্রতিষ্ঠানটি।
আনুষ্ঠানিক নাম অনেক সময় সমস্যাও তৈরি করে। ২০১৫ সালে মার্স (মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামেরও সমালোচনা করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
‘আমরা দেখেছি যে কিছু কিছু রোগের নামে নির্দিষ্ট কোন ধর্মের বা নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের জন্য নেতিবাচকতা উস্কে দেয়, যার কারণে ভ্রমণ, ব্যবসা-বাণিজ্যে অন্যায় আচরণের মুখে পড়ে তারা, আর অনেক সময় পশু-পাখিদের হত্যাও করা হয়,’ এক বিবৃতিতে একথা বলে সংস্থাটি।
যার কারণে, এটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। এই নীতিমালা অনুযায়ী, নতুন করোনাভাইরাসের নামকরণের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় থাকা উচিত নয় সেগুলো হচ্ছে:
এতে বলা হয় যে, নামটি হবে ছোট কিন্তু বর্ণনামূলক- যেমন সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম)।
ভাইরোলজির একজন অধ্যাপক বেঞ্জামিন নিউম্যান বলেন, ‘নামটি নির্ধারণের জন্য একটি সম্পর্ক বা হুকও দরকার। আইসিটিভির ১০ সদস্যের গবেষক দলের মধ্যেও তিনি একজন যারা নাম ঠিক করার দায়িত্বে রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নিউম্যান বিবিসিকে জানান, দুই সপ্তাহ আগে এই দলটি নাম নির্ধারণের জন্য আলোচনা শুরু করে এবং শেষ মেষ দুই দিনের আলোচনার পর তারা একটি নামের বিষয়ে নিয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছান। তারা এখন নামটি প্রকাশের জন্য একটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নালে জমা দিচ্ছে এবং আশা করা হচ্ছে যে, কয়েক দিনের মধ্যেই এটি ঘোষণা করা হবে।
জনগণের বোঝাপড়া ছাড়াও আইসিটিভি আশা করছে যে এটির প্রতিষেধক আবিষ্কারের গবেষণায় এটি গবেষকদের সময় বাঁচাবে এবং ঝামেলা কমাবে।
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে দেখবো যে আমরা ঠিক নামটি দিতে পেরেছি কিনা। আমার মতো কারো ক্ষেত্রে, একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাসের নামকরণে সহায়তা করতে পারাটা দীর্ঘস্থায়ী এবং পুরো কর্মজীবনের কাজের চেয়ে অনেক বেশি সহায়ক। এটা খুব বড় একটা দায়িত্ব।’
সূত্র: বিবিসি