সিলেটটুডে ডেস্ক | ০১ অক্টোবর, ২০১৫
আতঙ্ক গিলে খেয়েছে পরিবারটাকে। গত ৭০ বছরে যা কখনও ভাবতেই পারেনি বিসাদার সংখ্যালঘু পরিবারটি, সোমবার মাঝ রাতে তা-ই ছিল বাস্তব।
সব কিছু আবার আগের মতো কিছুতেই হওয়া সম্ভব নয়— এই কথাটাই এখন পাক খাচ্ছে গণিটুনিতে নিহত আকলাখের বাড়ির আনাচে কানাচে। শোকে মুহ্যমান গোটা পরিবার।
তুমুল দুর্যোগে বিধ্বস্ত হওয়ার পর কোনও জনপদ যেমন খাঁ খাঁ করে, মৃত ইকলাখের বাড়ি ঘিরে এখন তেমনই শূন্যতা। মাঝে মাঝে উঠছে মৃদু কান্নার রোল।
বিসাদা থেকে মন উঠে গিয়েছে পরিবারটার। ৭০ বছর ধরে উত্তরপ্রদেশের নয়ডার এই গ্রামে রয়েছেন তাঁরা। কিন্তু, হঠাৎই বুঝেছেন, আর সেখানে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই। আকলাখের পরিবার গোমাংস খেয়েছে বলে দাবি করে সোমবার মাঝ রাতে হঠাৎই তাঁর বাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রামবাসীদের একাংশ। গণপ্রহারে মৃত্যু হয় আকলাখের। তাঁর ছোট ছেলে ২২ বছরের দানিশও গুরুতর জখম হয়ে চিকিৎসাধীন। ঘটনার পর বিসাদায় পুলিশ মোতায়েন করেছে অখিলেশ যাদবের সরকার।
মৃতের বৃদ্ধা মা বললেন, “এখন পুলিশ আমাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু, স্থায়ীভাবে তারা গ্রামে থাকতে পারবে না। আমার এখন ভয় করছে। পুলিশ চলে গেলেই এমন ঘটনা আবার ঘটতে পারে। তাই ঠিক করেছি, গ্রাম ছেড়ে চলে যাব। এমন কোথাও যাব, যেখানে নিরাপদে থাকতে পারি।”
মৃতের বড় ছেলে সরতাজ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। তিনি বললেন, “আমার বাবার খুনিদের এমন শাস্তি হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায়।”
সরতাজও চাইছেন, পরিবারকে বিসাদা থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে।
আকলাখের মেয়ে সাজিদা জানিয়েছেন, হত্যাকারীরা তাকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছিলো।
সাজিদা বলেন, ‘‘রাতের খাওয়া শেষ করে বাবা তখন দোতলায় শুতে গিয়েছে। হঠাৎ শুনতে পেলাম গ্রামের মন্দিরে মাইক বাজিয়ে ঘোষণা করা হচ্ছে যে আমাদের বাড়িতে গরু মারা হয়েছে।’’ তার মিনিট খানেকের মধ্যেই আক্রমণ। কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই শ’খানেক লোকের ভিড় জমে গিয়েছিল আখলাকের বাড়ির বাইরে। সাজিদার ভাষ্যমতে, কারও হাতে লাঠি। কারও বা পাথর। সে সব নিয়েই দরজা ভেঙে সোজা বাড়ির ভিতর জনতা।
সাজিদা বলেন, ‘‘বাবাকে বাড়ির বাইরের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল ওরা। তার পর পাথর দিয়ে মাথায় আর বুকে মারতে লাগল।’’ কিছু ক্ষণের মধ্যেই মারা যান আখলাখ। দানিশ নয়ডার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অবস্থা সঙ্কটজনক। ‘‘ওরা আমাকেও ধর্ষণ করতে চেয়েছিল। ঠাকুমাকেও মারল,’’ বলেন সাজিদা। আধ ঘণ্টা চলেছিল এই তাণ্ডব। সাড়ে দশটা নাগাদ পুলিশের সাইরেন শোনা যায়। পড়িমরি করে ছুটে পালায় সবাই।
কিন্তু ওর বাবার ‘দোষ’ কী ছিল, তা এখনও বুঝতে পারেনি সাজিদা। ওই গ্রামেরই প্রবীণরা জানিয়েছেন, প্রায় ৭০ বছর ধরে ওখানেই বাস আখলাখ এবং তাঁর পরিবারের। বিসরা গ্রামে প্রায় ন’হাজার বাসিন্দার মধ্যে মাত্র দু’টি সংখ্যালঘু পরিবার। কিন্তু সেখানে কোনও হিংসার ঘটনা স্মৃতিতে নেই গ্রামবাসীদের। বরং নানা অনুষ্ঠানে, এমনকী গত ঈদেও তাদের বাড়িতে অনেকেই খাওয়া দাওয়া করে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন সাজিদা। ওর দাবি, ‘‘ফ্রিজে পাঁঠার মাংস ছিল, গরুর মাংস নয়।’’ আর সেই মাংস ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে পুলিশ।
১৯৫৫ সালের এক আইন অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশে গোহত্যা নিষিদ্ধ। পুলিশ জানিয়েছে, এই আইন অমান্য করলে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা ১০০০ টাকা জরিমানা বা দু’টোই হতে পারে।
বৃহস্পতিবারই বিসাদা ছেড়ে চলে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি। সঙ্গে অন্যান্য সংখ্যালঘু পরিবারও গুটিয়ে ফেলেছিল তল্পিতল্পা। উত্তরপ্রদেশ সরকার এই পরিস্থিতিতে আসরে নামে।
প্রশাসনের তরফে মৃতের বাড়ি গিয়ে বার বার আশ্বাস দেওয়া হয়, পরিবারের সব রকম নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে সরকার। তাই গ্রাম ছাড়ার প্রয়োজন নেই। প্রশাসনিক আশ্বাসে আপাতত নিরস্ত হয়েছে মৃত ইকলাখের পরিবার। কিন্তু, পরিজনরা আর চাইছেন না, বিসাদায় আর থাকুন তাঁরা। অচিরেই বোধ হয় সেই পথেই পা বাড়াবে দানিশদের পরিবার।