Sylhet Today 24 PRINT

সিলেট মেডিকেল গণহত্যা: একাত্তরের এই দিনে শহীদ হন ডা. শামসুদ্দিন, ডা. শ্যামলসহ অনেকে

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ০৯ এপ্রিল, ২০২৬

আজ ৯ এপ্রিল সিলেটে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (বর্তমান শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল) গণহত্যা দিবস। একাত্তরের এই দিনে সব আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানিরা। তাদের গুলিতে চিকিৎসরাত অবস্থায় শহীদ হন অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দিন আহমদ, ডা. শ্যামল কান্তি লালাসহ অনেকে।

এই ডা. শামসুদ্দিনের নামেই পরে সিলেট মেডিকেলের নামকরণ করা হয়। আর আ. শামসুদ্দিন ও ডা. শ্যামলকান্তিদের যেখানে সমাহিত করা হয় সেই স্থানটি পরবর্তীতে শহীদ বুদ্দিজীবী স্মৃতিসৌধ হিসেবে পরিচিতি পায়।

অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমদ ছিলেন সিলেট মেডিকেল হাসপাতালের শল্য বিভাগের প্রধান। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নিরাপত্তা নেই বলে মেডিকেল কলেজের অনেক অধ্যাপক, ছাত্র হোস্টেল ও হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু চারপাশে হত্যা ও ধ্বংস দেখেও শুধু পেশার প্রতি অঙ্গীকার ও মানবতার কারণে কর্মস্থল ছেড়ে যাননি শামসুদ্দীন আহমদ।

৮ এপ্রিল ইতালীয় সাংবাদিক ও সাহায্যকর্মী সমন্বয়ে গঠিত একটি দল ভারত থেকে তামাবিল দিয়ে সিলেট শহরে আসে। শামসুদ্দীন আহমদ তাঁদের গোটা হাসপাতাল ঘুরিয়ে নিরীহ নাগরিকের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নগ্ন হামলার প্রত্যক্ষ প্রমাণ তুলে ধরেন। এই ঘৃণ্য আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বক্তব্যও দেন। তাঁর বক্তব্য দলটি রেকর্ড করে (যা পরে ইতালিতে প্রচারিত হয়)।

পরদিন ৯ এপ্রিল মেডিকেল কলেজের পাশে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধ হয়। হাসপাতালের অদূরবর্তী টিলা থেকে প্রতিরোধ যোদ্ধারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কনভয়ে আক্রমণ করে। এতে কনভয়ের সামনের জিপ উল্টে যায় এবং তিনজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। এর পরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী হাসপাতাল এলাকা ঘিরে ফেলে। কিছুক্ষণ পর মেজর রিয়াজের নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সেনা হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করে।

আন্তর্জাতিক আইনে চিকিৎসক ও নার্স হত্যা অমার্জনীয় অপরাধ। কিন্তু এই আইন গ্রাহ্য করেনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী। হাসপাতালে কোনো প্রতিরোধ যোদ্ধার সন্ধান না পেয়ে তারা যাঁকেই সামনে পায়, তাঁকেই বাইরে এনে দাঁড় করাতে থাকে।

শামসুদ্দীন আহমদ ও তাঁর সহকারী ডা. শ্যামল কান্তি লালাকেও তারা টেনেহিঁচড়ে সীমানাপ্রাচীরের কাছে দাঁড় করায়। এ সময় শামসুদ্দীন আহমদ নিজের পরিচয় দিয়ে তাদের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করেন। পাকিস্তানি সেনারা প্রথমেই তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করে। তিনটি গুলি লাগে তাঁর শরীরে। একটি বাঁ ঊরুতে, দ্বিতীয়টি পেটে ও তৃতীয়টি বুকে।

ডা. শামসুদ্দিন আহমদের ছেলে ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ তাঁর ‘শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ : একটি আলোকবর্তিকা’ শিরোনামে এক লেখায় লিখেছেন- প্রায় জনশূন্য এবং ডাক্তারবিহীন হাসপাতালে আগলে রাখলেন মেডিকেল কলেজের সবচেয়ে প্রবীণ অধ্যাপক, সার্জারির প্রধান ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ। তরুণ ইন্টার্ন ডাঃ শ্যামল কান্তি লালা তার অধ্যাপককে ছেড়ে গেলেন না। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে এক কাপড়েই অনেক রোগী, মেয়ে নার্স, রোগীর স্বজনদেরকে হাসপাতাল ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সাবেক বিচারপতি সিনহা বললেন, তার চাচার গলব্লাডার অপারেশন করার পর দিন হাসপাতাল থেকে সরে যেতে বললেন, অন্য কোথাও অপারেশনের সুতাটা কেটে নিতে হবে। সিলেটের এক সময়ের মহিলা এমপি জেবুন্নেসা হকের সন্তান হয়েছে, তাকেও সরিয়ে দিলেন। নিজের পরিবারকেও আগেই গ্রামে পাঠিয়েছিলেন, তবে স্ত্রীকে বাড়িতে থেকে যেতে বললেন, কারণ নার্সরা চলে গেলে তাকে কাজে লাগাতে হবে। বিপদ বুঝেও অনড় রইলেন, যুদ্ধাহত মানুষ ভর্তি হাসপাতাল আগলে ধরে। সারা জীবনের পেশাগত দায়িত্ব আর মানবিক মূল্যবোধ তার কাছে আজ এক চ্যালেঞ্জ, কিন্তু প্রাণভয় তুচ্ছ করে তিনি অনায়াসে বেছে নিয়েছিলেন তার মহান কর্তব্যকে।

ডা. জিয়াউদ্দিন আরও লিখেন- আগরতলা ষড়যন্ত্রের আসামি ক্যাপ্টেন (অব) মুত্তালিব (তার বইতে লেখা) মাত্র কয়েকদিন আগে, ২৩ ডিসেম্বর, দ্রুত মোটরসাইকেলে এসে তাকে (ডা. শামসুদ্দিনকে) পাকিস্তানিদের করা একটি হত্যার লিস্ট দেখালেন। তৎকালীন খাদিমনগরের ইপিআর ক্যাম্পের একজন বাঙালি সুবেদার লুকিয়ে তাকে দিয়ে গেছে। লিস্টে ডাঃ শামসুদ্দিনের নাম উপরে জ্বলজ্বল করছে। মুত্তালিব লিখলেন, আমার চলে যাওয়ার দিকে তিনি এক নজরে তাকিয়ে ছিলেন। তাছাড়া পাকিস্তানিদের গুলিতে আহত লেফটেন্যান্ট ডাঃ সৈয়দ মাইনুদ্দিন আহমেদকে চিকিৎসা দিয়ে ৫ এপ্রিল তাড়াতাড়ি করে তাকে গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন। ডা. মাইনুদ্দিন এখনো বলেন, আমি কত বোঝালাম যে আপনি যুদ্ধের মাঝখানে আর এখন থাকবেন না। আমি তাদের ডাক্তার ছিলাম; তারা যদি আমাকে এইভাবে পশুর মতো গুলি করতে পারে, তাহলে তারা আপনাকে কোনোদিন ছাড়বে না।

ডাঃ শামসুদ্দিন চুপ করে থেকে বলেছিলেন, আমাকে হাসপাতালে থাকতে হবে, তুমি গিয়ে তোমার কাজে যোগ দাও। বিপদের আশঙ্কা জেনেও প্রিয়জন আর হিতৈষীদের একে একে বোঝালেন। তার চাচাকে বললেন, চিন্তা করবেন না, হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার-নার্সদের হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে। স্ত্রীকে বোঝালেন, তোমার ছেলেও তো যুদ্ধাহত হয়ে হঠাৎ আসতে পারে।

তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত জুনিয়র ডাক্তার ডা. শ্যামল কান্তি লালা, এম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলী, পুরুষ নার্স মাহমুদুর রহমান তার সাথে থেকে গেলেন। ৯ এপ্রিলে বিপ্লবীরা ভয়ানক যুদ্ধে শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য হল এবং সেই সময় হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যরা হাসপাতালে ঢুকে আহতদের সেবায় কর্মরত অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ, ডাঃ শ্যামল কান্তি লালা, এম্বুলেন্স ড্রাইভার আলী, পুরুষ নার্স মাহমুদুর রহমানসহ আরো কিছু রোগী ও তাদের পরিজনকে হাসপাতালের ভিতর হত্যা করে। তিনদিন পর তিন ঘণ্টার জন্য কার্ফু ভাঙলে তার চাচা, তৎকালীন এইডেড ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মৌলভী মঈনুদ্দিন হোসাইন, তাকে এবং অন্যান্যদের হাসপাতালের ভিতর রাস্তার পাশে মহিলা কলেজের দারোয়ান তৈয়ব আলী ও স্বল্প কিছু মানুষকে নিয়ে কবরস্থ করেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.