সিলেটটুডে ডেস্ক | ১০ আগস্ট, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের আপিল চলবে কি না, সে বিষয়ে শুনানির জন্য তারিখ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আগামী ১৭ আগস্ট এ বিষয়ে শুনানি হবে।
সোমবার (১০ আগস্ট) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হলেন বিচারপতি মোহাম্মদ রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
আবুল কালাম আযাদ নির্ধারিত সময়ের ১৩ বছর পর আপিল করার সুযোগ পেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তবে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি রায় ঘোষণার সময় আবুল কালাম আযাদ বিদেশে পলাতক থাকায় তিনি আপিল করতে পারেননি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর সেটিই ছিল ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়। তাতে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আটক, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ আটটি অভিযোগের মধ্যে সাতটি প্রমাণিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
২০২৪ সালের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ২০২৫ সালের মার্চে পাকিস্তান হয়ে আযাদের দেশে ফেরার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর সাজা স্থগিত চেয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তিনি।
সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তার দণ্ডাদেশ স্থগিত করে তখনকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে শর্ত দেওয়া হয়, আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাকে আপিল দায়ের করতে হবে।
এরপর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে আপিল প্রস্তুতের জন্য রায়ের সার্টিফায়েড কপি (নকল) ও অন্যান্য নথিপত্র চেয়ে আবেদন করেন আবুল কালাম আযাদ। পরে তিনি আপিলও দায়ের করেন।
যুদ্ধাপরাধী আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধ ট্রাইব্যুনালের ওই রায়ে বলা হয়, ১৯৪৭ সালের ৫ মার্চ ফরিদপুরের বড়খাড়দিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণকারী আবুল কালাম আযাদ রাজেন্দ্র কলেজে লেখাপড়া করেন। তিনি জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।
আদালত বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকার বাহিনী গঠনের আগ পর্যন্ত আযাদ পাকিস্তানি সেনাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন।
১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল তিনি ‘স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে একত্র হয়ে’ ফরিদপুরে পাকিস্তানি সেনাদের ‘অভ্যর্থনা’ জানান। আযাদ স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন এবং আলবদর বাহিনীরও প্রধান ছিলেন।
পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মিলে তিনি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও স্বাধীনতার পক্ষের বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংস নির্যাতন চালান বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে উঠে আসে।
মামলার বিচারিক কার্যক্রম
প্রথম ট্রাইব্যুনাল গঠনের এক বছরের মাথায় ২০১২ সালের ২২ মার্চ মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের মামলাটি দিয়েই শুরু হয় ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম।
২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষকে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ২ এপ্রিল তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন প্রসিকিউশন। একই সঙ্গে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনও করেন রাষ্ট্রপক্ষ। উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ এপ্রিল বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে ৩ এপ্রিল বাচ্চু রাজাকারকে গ্রেপ্তার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তার আগেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারত হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান বাচ্চু রাজাকার। ফলে ওই দিন পুলিশ তার রাজধানীর উত্তরার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হয়।
গত ২৬ জুলাই বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে তদন্ত কাজ শেষ করে ওই তদন্ত প্রতিবেদন (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেন তদন্ত সংস্থা।
৯ সেপ্টেম্বর আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তার বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, দেশান্তরিত ও ধর্মান্তরিতকরণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ১০টি ঘটনায় ২২টি অভিযোগের ভিত্তিতে মোট ৪৪৮ পৃষ্ঠার অভিযোগ দাখিল করা হয়।
২৩ সেপ্টেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার মাধ্যমে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। আর গত ৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল আবুল কালাম আযাদের অনুপস্থিতিতে বিচার শুরুর আদেশ দিয়ে তার পক্ষে আইনি লড়াই করতে সরকারের খরচে মো. আব্দুস শুকুর খানকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেন।
৪ নভেম্বর পলাতক আবুল কালাম আযাদ বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে ৮টি অভিযোগের ২২টি ঘটনার ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
গত ২৬ নভেম্বর বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষ। ওই দিন থেকে শুরু করে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন রাষ্ট্রপক্ষের মোট ২২ জন সাক্ষী।
সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূর হোসেন ও জব্দ তালিকার সাক্ষী বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) বুক শর্টার এস এম আমিরুল ইসলাম সাক্ষ্য দিয়েছেন। আর ২০ জন ঘটনার সাক্ষী হচ্ছেন, নেপাল চন্দ্র পাঠক, বাচ্চু রাজাকারের হাতে শহীদ চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী জোৎস্না রানী দাশ, মো: মোজাহের সিকদার, মো: ধলা মাতুব্বর, রঞ্জিত কুমার নাথ বাবু, শহীদ মাধব বিশ্বাসের পুত্র ভক্ত রঞ্জন বিশ্বাস, বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন, প্রফুল্ল রঞ্জন মণ্ডল, নগেন চন্দ্র মণ্ডল, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক তুষ্ট কুমার মণ্ডল, দেব কুমার দাস, রওশন আলী বিশ্বাস, একজন ক্ষতিগ্রস্ত নারী (ক্যামেরা ট্রায়াল), বিনোদ চন্দ্র বিশ্বাস, প্রবোধ কুমার সরকার, আব্দুল মান্নান, শহীদ পরিবারের সদস্য সুশীল কুমার পোদ্দার, আবু ইউসুফ সিদ্দিকী পাখি, সত্য রঞ্জন সাহা এবং অসিত বরণ সাহা। তাদের সবার বাড়ি ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায়।
ট্রাইব্যুনালে নিযুক্ত বাচ্চু রাজাকারের আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান তাদের জেরা সম্পন্ন করেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষ কোনো সাক্ষী তালিকা দিতে না পারায় বাচ্চু রাজাকারের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য ছাড়াই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২৩, ২৪ ও ২৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ এবং ২৪ ও ২৬ ডিসেম্বর আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ‘যুদ্ধাপরাধ’
জামায়াতের সাবেক এই রুকনের বিরুদ্ধে আনা আট অভিযোগের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও অষ্টম অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধকালে অপহরণ, আটকে রাখা ও নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে সকাল ১০টার দিকে আযাদ ও তার সহযোগীরা ফরিদপুর শহরের খাবাশপুরের রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে ধরে নির্যাতন করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর আকরাম কোরাইশির সঙ্গে মুজাহিদও উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে রণজিৎকে হত্যার জন্য ফরিদপুর জিলা স্কুলের সামনে এবং পরে বিহারি কলোনির পূর্বাংশে মোল্লাবাড়ি রোডে রশিদ মিয়ার বাড়িতে নিয়ে যান আযাদ। সেখানে আটকে রেখে রণজিতের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তবে গভীর রাতে রণজিৎ জানালা ভেঙে পালিয়ে যান।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ২৬ জুলাই বেলা ১১টার দিকে আলফাডাঙ্গা থেকে ধরে আনা আবু ইউসুফকে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আটকে রেখে আযাদ অমানবিক নির্যাতন করেন। ইউসুফ স্টেডিয়ামের বিভিন্ন ঘরে খলিলুর রহমান, মাসুদ, হামিদসহ ৪০০-৫০০ নারী ও পুরুষকে আটক অবস্থায় দেখেন। এক মাস ১৩ দিন সেখানে আটক থাকাকালে কিশোরীদের অপহরণ করে এনে তাদের ওপর আযাদ ও তার সহযোগীদের নির্যাতন চালাতে দেখেন ইউসুফ।
অষ্টম অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৮ মে সকাল ১০টার দিকে আযাদ সাত-আটজন রাজাকার সদস্যকে নিয়ে সালথা থানার উজিরপুর বাজারপাড়া গ্রাম থেকে হিন্দু এক তরুণীকে অপহরণ করে খাড়দিয়া গ্রামের চান কাজীর বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করেন। সাত-আট দিন পর মুক্তি পান ওই তরুণী।
হত্যা: তৃতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ অভিযোগে আযাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৪ মে আযাদ ১০-১২ জন রাজাকার সদস্যসহ বোয়ালমারী থানার কলারন গ্রামের সুধাংশু মোহন রায়কে গুলি করে হত্যা করেন। এ সময় সুধাংশুর বড় ছেলে মনিময় রায় গুলিতে গুরুতর আহত হন।
চতুর্থ অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বছরের ১৬ মে বেলা ৩টার দিকে আযাদ ১০-১২ জন রাজাকার সদস্যকে নিয়ে সালথা থানার (সাবেক নগরকান্দা) পুরুরা নমপাড়া গ্রামে যান এবং মাধব চন্দ্র বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা করেন। আর ৩ জুন আযাদের নেতৃত্বে ১০-১২ জন রাজাকার সদস্য সালথার ফুলবাড়িয়া গ্রামে হিন্দুপাড়ায় লুটপাট চালায়। সেখানে তারা চিত্তরঞ্জন দাসকে গুলি করে হত্যা করে বলে ষষ্ঠ অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ধর্ষণ: পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ৮ জুন দুপুর ১২টার দিকে আযাদ রাজাকার সদস্যদের নিয়ে বোয়ালমারী থানার নতিবদিয়া গ্রামের এক হিন্দু বাড়িতে হামলা চালান। আযাদ ও তার সহযোগীরা ওই বাড়ির দুই নারীকে ধর্ষণ করেন।
গণহত্যা: সপ্তম অভিযোগে বলা হয়, ১৭ মে রাজাকার বাহিনীর ৩০-৩৫ জন সদস্যকে নিয়ে আযাদ বোয়ালমারী থানার হাসামদিয়া গ্রামের হিন্দুপাড়ায় লুটপাট চালন এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। পরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শরৎ চন্দ্র পোদ্দার, সুরেশ পোদ্দার, শ্যামাপদ পোদ্দার, যতীন্দ্র মোহন সাহা, নীল রতন সমাদ্দার, সুবল কয়াল ও মল্লিক চক্রবর্তীকে হত্যা করেন তারা। হরিপদ সাহা ও প্রবীর কুমার সাহা ওরফে পুইট্যাকে অপহরণের পর ময়েনদিয়া বাজারের নদীর ঘাটে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।