নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৫ অক্টোবর, ২০১৫
সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের আশ্রয় আর শিক্ষা দিতে গিয়ে একমাস থেকে বিনা দোষে কারাগারে বন্দি হয়ে আছেন অদম্য বাংলাদেশের চার তরুণ-তরুণী। পুলিশি তদন্ত আর আইনি মরপ্যাচে ফেলে তাদের দীর্ঘদিন থেকে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
তাদের অন্যায়ভাবে বন্দি করে রাখার বিষয়টি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাসহ সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারছেন না। যদিও তাদের গ্রেফতারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সকলে সোচ্চার হলেও বিভিন্ন ইস্যুর ভিড়ে হারিয়ে গেছে তাও।
অদম্য বাংলাদেশের গল্পটা যে কাউকে স্পর্শ করার মত। ঢাকা শহরের একদল ছেলেমেয়ে নিজেদের পকেটের টাকা বাঁচিয়ে সিদ্ধান্ত নিল সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের জন্য কিছু একটা করবে। ভালো এই চিন্তার সাথে একে একে যুক্ত হল কয়েকশত সেচ্ছাসেবী।
সিদ্ধান্ত নিল একটি স্কুল খুলবে নাম দিবে মজার স্কুল। কেউ বই জোগাড় করল, কেউ খাতা কলম এভাবে সযত্নে পথশিশুদের শিক্ষা দেয়া শুরু করল তারা। গড়ে উঠল অদম্য বাংলাদেশ নামে একটি শেল্টার হোম। সেখানে গৃহহীনদের আশ্রয় মিলল, খাবার মিলল যা কিনা দেয়ার কথা থাকলেও রাষ্ট্র দিতে পারেনা। কিন্তু সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের ভালোবাসাই কাল হয়ে দাঁড়ালো উদ্যোক্তাদের জন্য। আইনের মারপ্যাঁচে প্রায় এক মাস ধরে কারাবন্দি 'নির্দোষ' চার তরুণ-তরুণী। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা নাকি শিশু পাচারে যুক্ত!
কোন এক শিশুর চাচার করা এক মামলায় জেলের ঘানি টানছেন তারা। অথচ সেই শিশুদের বাবা-মাদের কোন অভিযোগ নেই। তারা সকলেই বলছেন অদম্য বাংলাদেশ তাদের সন্তানদের আশ্রয় দিয়েছে, যত্ন করে শিক্ষা দিচ্ছে। তবে কেন কারাবন্দি তারা। প্রশ্ন করলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন - 'তদন্ত চলছে'।
গ্রেফতারকৃত আরিফুর রহমান, জাকিয়া সুলতানা, হাসিবুল হাসান সবুজ ও ফিরোজ আলম খান শুভর বিরুদ্ধে শিশু পাচারের অভিযোগের ব্যাপারেও কোনই তথ্য বের করতে পারেনি পুলিশ। পথশিশুদের সেবায় আশ্রয়কেন্দ্র 'বায়ান্ন' ও তাদের পাঠদানের জন্য 'মজার স্কুল' কার্যক্রম চালু করে এই তরুণ-তরুণীরা এখন পুলিশের বিবেচনায় 'অপরাধী'। তারা কেউ চাকরি, কেউ টিউশনি করে আয় করা অর্থের একাংশ দিয়ে এবং শিক্ষার্থীরা হাতখরচের টাকা দিয়ে এই মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
গ্রেফতারকৃত হাসিবুল হাসান সবুজ এইচএসএসসি এবং এসএসসি- দুটো পরীক্ষাতেই এ প্লাস পেয়েছেন। পরে অদম্য বাংলাদেশের উদ্যোগের সাথে যুক্ত হন আর এখন সেই 'অপরাধে' জেলে থাকার কারণে এবার কোনো ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারছেন না তিনি।
গ্রেফতারকৃত নারী সদস্য জাকিয়া সুলতানা টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাতেন, সাথে অদম্য বাংলাদেশের হয়ে সেচ্ছাসেবীর কাজ। সম্প্রতি তাঁর পরীক্ষা থাকলেও জেলে থাকার কারণে সেটাও অনিশ্চিত।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম জানান, মামলাটির তদন্ত চলছে। গ্রেফতারকৃতরা নির্দোষ হলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। তবে তদন্তে অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, রামপুরার বনশ্রীতে অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে গত ১২ সেপ্টেম্বর ১০ শিশুকে 'উদ্ধার' করে পুলিশ। এ সময় আশ্রয়কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা চার তরুণ-তরুণীকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ বলছে, মোবারক নামে সেখানে থাকা এক শিশুর চাচা অভিযোগ করেন, তার ভাতিজাকে আশ্রয়কেন্দ্রে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে। এই অভিযোগে তিনি মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা করেন। এর ভিত্তিতে চারজনকে গ্রেফতারের পর দু'দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মোবারককে তার চাচার কাছে এবং অপর নয় শিশুকে পাঠানো হয় টঙ্গীর শিশু-কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে।
তবে এত বিপদের মধ্যেও আদম্য বাংলাদেশের বাকি সেচ্ছাসেবিরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আশ্রয় কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও চালু আছে মজার স্কুল। অদম্য বাংলাদেশের চার তরুণ-তরুণীদের মুক্ত করে দিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।