Sylhet Today 24 PRINT

পদ্মার দুই পাড়ের স্বপ্নের সংযোগ

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর শতভাগ দৃশ্যমান

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণের ৫ বছর পূর্তির দুই দিন আগে খুঁটির ওপর বসল সর্বশেষ ৪১তম স্প্যান। আর স্প্যানটি খুঁটিতে স্থাপন করায় এর মধ্য দিয়ে সেতুর মূল অবকাঠামো শতভাগ দৃশ্যমান হলো। বাস্তবে ধরা দিল স্বপ্ন। স্বপ্নের ৬.১৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান হলো আজ।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাওয়া প্রান্তে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির ওপর সর্বশেষ ৪১তম স্প্যানটি বসানো হয়। ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ স্প্যানটি স্থাপিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মিলিত হলো প্রমত্ত পদ্মার দুই তীর। এর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৯ জেলার সঙ্গে সারা দেশের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হচ্ছে।

এরপর দ্বিতল এই সেতুর ঢালাইয়ের কাজ, অ্যাপ্রোচ রোড ও ভায়াডাক্ট প্রস্তুত করা, রেলের জন্য স্ল্যাব বসানো শেষ হলে স্বপ্নের পদ্মাসেতু যানবাহন চলাচলের উপযোগী হবে। আর এক বছরের মধ্যেই সেতুটি চালু করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

৩২০০ মেট্রিক টন ওজনের ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটি মাওয়ার কুমারভোগের কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে নিয়ে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির কাছে পৌঁছে যায় ভাসমান ক্রেইন ‘তিয়ান ই’। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ইঞ্চি মেপে শুরু হয় স্প্যান স্থাপনের কাজ।

যে ৪১টি স্প্যান দিয়ে পুরো পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে জাজিরা প্রান্তে ২০টি বসানো হয়েছে, আর মাওয়া প্রান্তে বসানো হয়েছে ১৯টি স্প্যান। একটি স্প্যান বসেছে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের মাঝখানে। এবার শেষ স্প্যানটি বসার মাধ্যমে দুই প্রান্ত জোড়া লাগল।

বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ, পরে দাতাদের বাদ দিয়ে সরকারের নিজ অর্থে সেতু করা, রাজনৈতিক বাদানুবাদ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগসহ নানা কারণে এই সেতুর প্রতিটি স্প্যানই খবর হয়ে এসেছে জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে। দেশবাসীর মধ্যেও সেতুটি নিয়ে আগ্রহ প্রবল। স্বভাবতই যখন শেষ কয়েকটি স্প্যান বসানো হয়, সেতু নিয়ে আগ্রহ ততই বাড়তে থাকে।

স্টিলের তৈরি স্প্যানগুলোর বিভিন্ন অংশ তৈরি হয়েছে চীনের কারখানায়। পরে সেগুলো জোড়া দিয়ে ১৫০ মিটারের আকার করা হয় মুন্সিগঞ্জের কুমারভোগের কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে। সেখানে স্প্যান জোড়া লাগানোর পাশাপাশি রঙ করে পাঠানো হয় সেতুর কাছে।

তিন হাজার দুইশ টন ওজনের একেকটি স্প্যান কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে সেতু পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে কাজে লাগানো হয় তিন হাজার ৭০০ টনের বিশাল একটি ক্রেন। এত শক্তিশালী ক্রেন দুনিয়াতে আছে অল্প দুই একটিই।

পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোতে থাকছে কংক্রিট ও স্টিল। সেতুর ওপরের অংশে তৈরি হচ্ছে সড়ক পথ। সেতুর সড়ক তৈরির কাজে প্রয়োজন হবে দুই হাজার ৯২৭টি রোড স্ল্যাব। গত শুক্রবার শেষ স্প্যানের আগেরটি বসানোর দিন অবধি বসানো হয় এক হাজার দুইশটির বেশি স্ল্যাব।

থেমে নেই নিচ তলায় রেলপথ নির্মাণ কাজ। সেতুর নিচতলায় এসে দেখা যায়, লোহার রডের কাঠামো তৈরি করে দেয়া হয়েছে কংক্রিটের ঢালাই। সেগুলো ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করছেন শ্রমিকরা।

দেশের সবচেয়ে বড় এই সেতুটির জন্য শুরু থেকে অর্থায়ন জটিলতা ছাড়াও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় মাটির নিচের গঠনজনিত জটিলতা। ৪২টি পিলারের মধ্যে ২২টির নকশা পাল্টাতে হয়েছে। সেটির সমাধানও হয়েছে অভিনব উপায়ে।

২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুর মূল কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তখন ২০১৮ সালের মধ্যে সেতুর নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়।

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করে পদ্মা সেতু। শুরুর দিকে স্প্যান বসানে সময় লেগেছে বেশি। এক কিলোমিটার দৃশ্যমান হতে সময় লেগেছে দেড় বছর। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সপ্তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে সেতুর এক কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়।

ওই বছরের ২৯ জুন ১৪তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে সেতুর দুই কিলোমিটারের কিছু বেশি দৃশ্যমান হয়।

২০২০ সালের ১ জানুয়ারি ২০তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় সেতুর তিন কিলোমিটার।

চলতি বছর সেতুর কাজ আরও দ্রুত গতিতে আগায়। গত ২৮ মার্চ ২৭তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় সেতুর চার কিলোমিটারের কিছু বেশি।

পরের এক কিলোমিটার দৃশ্যমান হতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে করোনা পরিস্থিতির কারণে। মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে সেতুর চীনা কর্মীদের একটি অংশ দেশে ফিরে যান। তখন সেতুর কাজ অনেকটাই থমকে দাঁড়ায়।

তবে অক্টোবর থেকে সেতুর কাজে আবার গতি আসে। তখন থেকে প্রতি সপ্তাহেই একটি করে স্প্যান বসানো হতে থাকে। গত ২৫ অক্টোবর ৩৪তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে সেতুর পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দৃশ্যমান হয়।

৪ ডিসেম্বর ৪০তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে সেতুর ছয় কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়। আর ছয় দিনের মাথায় বসানো হয় শেষ স্প্যানটি। এর আগে এত কম সময়ে বসেনি কোনো স্প্যান।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.