নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৩ নভেম্বর, ২০১৫
১৯৮৫ সালে ট্রাকের হেলপারের মধ্য দিয়ে যার জীবন শুরু, পরে সে হয়ে যায় কুখ্যাত 'গডফাদার'। চলে আসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। খুন, চাঁদাবাজি, অবৈধ দখলদারিত্বই যেনো তার নেশা ও পেশা।
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের উত্থানের কাহিনী যেন রূপকথাকেও হার মানায়।
তার নির্দেশে এবং অর্থায়নে সংঘটিত হয় দেশের অন্যতম আলোচিত রোমহর্ষক সাত খুনের ঘটনা। এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে কোটি কোটি টাকা ঢালতে হয় তাকে। ব্যবহার করেন দেশের এলিট ফোর্স র্যাবকে। অভিযুক্ত র্যাব সদস্যদের আদালতে বিচার চলছে। হত্যাকাণ্ডের পর ভারতে পালিয়েও পার পাননি নূর হোসেন। সেখানে গিয়ে ধরা পড়েন। বৃহস্পতিবার তাকে ভারত থেকে ফেরত আনা হয়েছে। এখন বিচারের মুখোমুখি করা হবে তাকে।
বিভিন্ন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে ট্রাকের হেলপার ছিলেন নূর হোসেন। বছর খানেক এ কাজ করার পর হয়ে যান ট্রাকের চালক। ১৯৮৭ সালে তার বাবা বদরুদ্দিন একটি পুরনো ট্রাক কেনার পর সেটি চালাতেন তিনি। কিছু দিন চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক হিসেবে।
এর মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১৯৯২ সালে বিএনপির সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিনের ছত্রচ্ছায়ায় সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিন বছর বাদে ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে আদমজীতে খালেদা জিয়ার জনসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। শুরু করেন প্রকাশ্যে রাজনীতি।
এর আগে তৎকালীন বিএনপির নেতা বর্তমানে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের গাড়িতে বোমা হামলা করে আলোচনায় আসেন নূর হোসেন। আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান এমপি হওয়ার পর দলবদল করেন নূর হোসেন। ১৯৯৮ সালে চলে যান শামীম ওসমানের ছত্রচ্ছায়ায়। গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার কয়েক দিন আগে প্রতিপক্ষ নজরুল ইসলাম তাকে হত্যার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৯৬ সালের মার্চে শিমরাইল মোড়ে নূর হোসেনের বাহিনীর গুলিতে নিহত হন রিকশাচালক আলী হোসেন। ২০০০ সালের ১ অক্টোবর থানা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে যুবলীগ নেতা মতিনকে গুলি করে হত্যা করে নূর হোসেনের বাহিনী।
২০০১ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে দেশ থেকে পালিয়ে যান তিনি। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের এক নেতার সঙ্গে ভারতে সফল বৈঠকের পর ও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর দেশে ফেরেন নূর হোসেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের নেতাদের পেছনে মোটা অংকের টাকা খরচ করে ২০১৩ সালের ২৯ মে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতির পদ বাগিয়ে নেন। টাকা লেনদেনের ব্যাপারটি পরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ে। অথচ এর আগে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগে তার সদস্যপদও ছিল না।
এরই মধ্যে নূর হোসেন হয়ে উঠেন নারায়ণগঞ্জের অন্যতম চাঁদাবাজ। নিজস্ব বাহিনী দিয়ে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন তিনি। যদিও নূর হোসেনের দাবি- অন্তত সাড়ে ৩'শ লোকের কর্মসংস্থান করেছেন তিনি। তারা নিয়মিত ভাড়া (চাঁদা) আদায় করে।
এ বিষয়ে তার বক্তব্য ছিল, প্রতিদিন সাড়ে ৩শ লোক তার অধীনে কাজ করত। তারা নানারকম ফুটফরমায়েশ, ট্রাক, বিভিন্ন যানবাহন, ফুটপাতের দোকান, বালু-পাথর ঘাট, কাঁচাবাজার, মুরগি-মাছের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভাড়া (চাঁদা) তোলার কাজ করছে।এই লোকগুলোর প্রতিজনের দৈনিক পারিশ্রমিক ৫০০ টাকা করে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা দিচ্ছেন তিনি।
সিদ্ধিরগঞ্জের চুন, বালু ও পাথর ব্যবসাও ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। তাকে মাসোয়ারা না দিয়ে ব্যবসা করা ছিল অসম্ভব। নারায়ণগঞ্জ সদর ও ফতুল্লা থানা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় চাঁদাবাজি, বিস্ফোরক, মাদক, ভূমি দখলসহ বিভিন্ন ধারায় ১৮টি মামলা ছিল নূর হোসেনের বিরুদ্ধে। তবে ১৯৯৬ সালে আলী হোসেন হত্যাসহ ৯টি মামলায় খালাস পান তিনি। বাকি মামলাগুলোতে জামিনে রয়েছেন।
বর্ণাঢ্য জীবনে ১৯৯২ সালের আগে জাতীয় পার্টি, এরপর বিএনপি ও সর্বশেষ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন তিনি। পুলিশের অপরাধীর তালিকায় দীর্ঘদিন নাম এবং ইন্টারপোলের রেড ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হলেও ২০১১ সালে সে তালিকা থেকে তার নাম কাটিয়ে নেন। সাত খুনের মামলায় ভারতে পালানোর পর আবার ওয়ান্টেড হিসেবে নূর হোসেনের নাম প্রকাশ করে ইন্টারপোল।
সিদ্ধিরগঞ্জের সন্ত্রাসীদের গডফাদার নূর হোসেনের সঙ্গে নিহত (সাত খুনের একজন) প্যানেল মেয়র নজরুলের মধ্যকার কোন্দলের সূত্রপাত ১৯৯৭ সালের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে।
দুজনই ছিলেন নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী। নির্বাচনে দুটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত হলে নূর হোসেন গ্রেফতার হয়ে সাত দিন কারাভোগ করেন। এরপর হাইকোর্টের নির্দেশে পুনরায় ভোট গ্রহণ হলে জয়ী হন নূর হোসেন। এরপর তারা একে অপরকে মেরে ফেলতে কয়েক দফা আক্রমণ করেন কিলার দিয়ে।
১৯৯৮ সালে নজরুলের কিলারের গুলিতে আহত হয়েছিলেন নূর হোসেন। ওই যাত্রায় বেঁচে গিয়ে ২০০০ সালে নূর হোসেন বাহিনী নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে নজরুল ইসলামের ওপর হামলা চালান। ওই ঘটনায় মতিন নামে এক যুবক নিহত হন। এরপর ১৭ বছর দুজন দুজনের এলাকায় প্রবেশ করেননি। নূর হোসেন ও নজরুলের বিরোধের শেষ পরিণতি ছিল সাত খুনের ঘটনা।