সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৩ মে, ২০২১
জাতীয় হটলাইন ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিয়ে খাদ্য সহায়তা চেয়ে হয়রানির অভিযোগে শাস্তি হিসেবে ১০০ গরিব পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে বিপাকে পড়েছেন ফরিদ আহমেদ নামে এক ব্যক্তি ও তার পরিবার। তার দাবি ভ্রাম্যমাণ আদালতের তিন মাসের জেল থেকে বাঁচতে তিনি ঋণ করে ও সোনার গয়না বন্ধক রেখে ১০০ প্যাকেট খাবারের টাকা জোগাড় করেন। পরে শনিবার (২২ মে) বিকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ১০০ প্যাকেট খাদ্য সামগ্রীর প্যাকেট বুঝিয়ে দেন তিনি।
বিকালে সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের দেওভোগ এলাকায় ফরিদ আহমেদের বাড়ির সামনে গিয়ে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন ইউএনও আরিফা জুহুরা। খাদ্য সামগ্রীর প্যাকেটের মধ্যে ছিল পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি লবণ, আলু, পেয়াজ ও তেল।
ইউএনওর হাতে খাদ্য সহায়তা প্রদান করে ফরিদ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, গত বুধবার আমি এফএম রেডিও’র মাধ্যমে জানতে পারি সরকারি ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলে সরকার খাদ্য সহায়তা দেয়। এ কারণে আমি ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চাই।
তিনি দাবি করেন, আমার চার তলা বাড়িটি পৈতৃক সম্পত্তি। আমরা ৬ ভাই এবং এক বোন উত্তরাধিকার সূত্রে এই বাড়ির মালিক। আমি তিন তলার ওপর ছাদে টিনশডে দুটি রুম ও নিচ তলায় একটি রুম পেয়েছি। অন্যগুলোতে বাকি পাঁচভাই বসবাস করেন। তিনি মাসুদ আহমেদ নামের একটি হোসিয়ারী কারখানায় ১২ হাজার টাকা বেতনে কাটিংয়ের কাজ ও দেখাশোনা করেন। তার এক ছেলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এবং তিনি নিজেও স্ট্রোক করেছেন।
ফরিদ আহমেদ আরও বলেন, আমার খাদ্য প্রয়োজন ছিল বলেই ফোন করেছি। পর দিন উপজেলা থেকে খাদ্য সহায়তা করা হবে জানান। এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় কাশিপুর ইউনিয়নে পরিষদের (ইউপি) সদস্য আইয়ুব আলী আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন আপনি এই খাদ্য পাওয়ার উপযুক্ত নন। আপনি স্বাবলম্বী, চার তলা বাড়ির মালিক। এই কথা বলে আমাকে নানাভাবে ধমকাতে থাকেন। পরে আমি বলি আমি যদি এই খাদ্য সহায়তা পাওয়ার উপযোগী না হই কল করে আমি ভুল করেছি, পরে আমি ভুল স্বীকারও করেছি। এর কিছুক্ষণ পর ইউএনও স্যার আসেন এবং আমাকে ডেকে নিয়ে নানা প্রশ্ন করার পর ১০০ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। এসময় ইউএনও স্যার চলে যাওয়ার পর ইউপি সদস্যসহ অন্যরা খাদ্য সহায়তা করা না হলে তিন মাসের সাজা হবে বলে জানান।
এদিকে ইউএনওর কাছে ১০০ প্যাকেট খাদ্য সহায়তা তুলে দেওয়ার পর ফরিদ আহমেদের স্ত্রী হিরণ বেগম বলেন, গত দু’দিন বহু চেষ্টা চালিয়ে স্বামীকে জেলের হাত থেকে বাঁচাতে সোনার গয়না বন্ধক রেখে চড়া সুদে ঋণ করে এবং ইউপি সদস্য আইযুব আলীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নিয়ে মোট ৬৫ হাজার টাকার খাদ্য সামগ্রী কিনেছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা নিজেরাই চলতে পারি না। প্রতিবন্ধী ছেলে নিয়ে পুরো পরিবার এমনিতেই সংকটে, বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ফরিদ আহমেদের ছোটভাই সেলিম খানের স্ত্রী বিলকিস বেগম বলেন, বড় ভাসুর ফরিদ আহমেদ ব্রেন স্ট্রোক করেছেন। যে কারণে তিনি গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না। তার মানসিক সমস্যাও রয়েছে। গতরাতে তিনি দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। আমরা তাকে সারারাত পাহাড়া দিয়ে রাখি এবং টাকা পয়সা জোগাড় করতে সহায়তা করি।
স্থানীয়রাও ফরিদ আহমেদের পরিবারের এই শাস্তি মেনে নিতে পারেননি। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে ফরিদ আহমেদকে ১০০ প্যাকেট খাদ্য সহায়তার বিষয়টি চাপিয়ে দিয়ে লঘু পাপের গুরু দণ্ড দিয়েছেন বলে মেনে করেন তারা। তাদের অভিযোগ, ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চাওয়ায় ইউপি সদস্য ক্ষুদ্ধ হয়ে উপজেলা প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে এই কাজটি করিয়েছেন।
তবে ইউপি সদস্য আইয়ুব আলী বলেন, ফরিদ আহমেদ ৩৩৩ খাদ্য সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ত নন। তাদের চারতলা বাড়িতে সব ভাই-বোন মিলে মিশে থাকেন। তবে ফরিদ আহমেদের পক্ষে ১০০ প্যাকেট খাদ্য বিতরণ করার আর্থিক সঙ্গতি নেই। আমি উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি বার বার জানিয়েছি। করোনাকালে কাউকে এই শাস্তি দেওয়া ঠিক হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে আমি নিজেও তাকে ১০ হাজার টাকা ধার দিয়েছি।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা বলেন, কল করা ব্যক্তি খাদ্য সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ত কিনা তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বা ইউপি সচিবের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করা হয়। ওই ব্যক্তির ফোন পেয়ে খাদ্য সহায়তা নিয়ে তার বাড়িতে যাওয়া হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী জানতে পারি তিনি চারতলা বাড়ির মালিক ও হোসিয়ারি কারখানার মালিক। চারতলা বাড়ি ও হোসিয়ারি কারখানা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে ওই ব্যক্তিও তা স্বীকার করেন। তখন তাকে অযথা সরকারি লোকজনকে হয়রানির দায়ে শাস্তি হিসেবে ১০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানাই। খাদ্য সহায়তা করার জন্য তাকে দুই দিন সময়ও দেওয়া হয়।
ইউএনও আরও বলেন, দুই দিন সময় দেওয়ার পর তিনি বিষয়টি নিয়ে আমাদের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ করেননি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়নি, তাকে সরকারি কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টির দায়ে ১০০ গরিব পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানালে তিনি তাতে রাজি হন।
তবে তার বিষয়ে নানা তথ্য এসেছে জানিয়ে ইউএনও আরও বলেন, এখন আমরা তথ্য পাচ্ছি ওই ব্যক্তি চারতলা পুরো বাড়ির মালিক নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তিনি যদি সত্যিই খাদ্য সহায়তা পাওয়ার উপযোগী হন এবং তিনি যদি চান তাকে খাদ্য সহায়তা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার জাতীয় হটলাইন নম্বর ৩৩৩ ফোন করে খাদ্য সহায়তা চান সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের দেভোগ নাগবাড়ি এলাকার ফরিদ উদ্দিন। খাদ্য সহায়তা করতে গিয়ে উপজেলা প্রশাসনের লোকজন জানতে পারেন সাহায্য চাওয়া ওই ব্যক্তি একটি চারতলা বাড়ি এবং হোসিয়ারি কারখানার মালিক। তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও আরিফা জহুরা ৩৩৩ ফোন করে অযথা হয়রানি ও সময় নষ্ট করার দায়ে তাকে শাস্তি হিসেবে দু’দিন পর শনিবার ১০০ গরিব লোককে খাদ্য সহায়তার নির্দেশ দেন।