সিলেটটুডে ডেস্ক | ০২ অক্টোবর, ২০২১
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য
সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটার জন্য কেনা জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের ছেলে সুপ্রিয় ভট্টাচার্যের নামে। যশোরের মণিরামপুরের রোহিতা ইউনিয়নে এ ২০০ শতক জমি কেনা হয়েছে ৮০ লাখ টাকায়। তবে জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ এড়াতে ছেলের নামে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রতিমন্ত্রী।
মণিরামপুর ভূমি ও রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রোহিতা ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গ্রামের ৮৪৫ নম্বর খতিয়ানের ৭৬, ৭৭, ৭৯ ও ৮৯ দাগের ২০০ শতক জমি কিনেছেন প্রতিমন্ত্রীর ছেলে সুপ্রিয় ভট্টাচার্য। গত ১৪ সেপ্টেম্বর তার নামে এ জমি রেজিস্ট্রি করা হয়, যার দলিল নম্বর ৭৬৭১। আর এ জমির নামপত্তনের জন্য উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে দাখিল করা কেস নম্বর ১২০১ (২০২১-২২)।
জমিটি মন্ত্রীপুত্রের কাছে বিক্রি করেছেন রোহিতা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। সুপ্রিয় ভট্টাচার্যের কাছে ৮০ লাখ টাকায় তিনি জমিটি বিক্রি করেছেন বলে জানিয়েছেন। যদিও রেজিস্ট্রি অফিস সূত্র বলছে, জমির দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে ১৯ লাখ টাকা।
মিল্ক ভিটার নামে কেনা জমি কেন তার ছেলের নামে রেজিস্ট্রি করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিল্ক ভিটার নামে কেনার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে, তাছাড়া সময়সাপেক্ষও। তাই মূলত জমিটা আটকাতে এ পথ নেয়া হয়।
এর আগে বুধবার মণিরামপুরে এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মীদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ আনেন। আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস উপলক্ষে বুধবার মণিরামপুরে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটার কারখানা করার জন্য আমি গত সপ্তাহে আমার ছেলের নামে একটি জমি রেজিস্ট্রি করতে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্নীতির রেট অনুযায়ী টাকা দিতে না পারায় সেই জমি রেজিস্ট্রি হয়নি।’ তার এ বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
তবে মন্ত্রীর অভিযোগ অস্বীকার করে মণিরামপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার শাহাজান আলী বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের জমি বেচাকেনার ক্ষেত্রে মোট দামের সাড়ে ৬ শতাংশ টাকার পে-অর্ডার রেজিস্ট্রির সময় জমা দিতে হয়। কিন্তু গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে পে-অর্ডার ছাড়াই মন্ত্রীপুত্র সুপ্রিয় ভট্টাচার্যের অনুকূলে ২০০ শতক (ছয় বিঘা) জমি রেজিস্ট্রি করার জন্য দলিল জমা দেয়া হয়। ফলে তাদের পে-অর্ডারসহ দলিল জমা দিতে বলা হয়। সেদিন বিকাল ৫টায় পে-অর্ডারের কপি জমা দিলে সিরিয়াল ভেঙে সঙ্গে সঙ্গেই দলিলটি রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়। এমনকি রেজিস্ট্রির ২ ঘণ্টার মধ্যে দলিলের নকল বা সার্টিফায়েড কপিও ক্রেতাকে সরবরাহ করা হয়।
ওই অফিসের মোহরার শামসুজ্জামান মিলন বলেন, সাধারণত দলিল রেজিস্ট্রির ১৫ দিনের আগে দলিলের নকল সরবরাহ করা হয় না। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর লোকজনের চাপে নিয়মিত কাজ বাদ রেখে ২ ঘণ্টার মধ্যে অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা নকল কপি সরবরাহ করেন। আবার উপজেলা ভূমি অফিসে নামপত্তনের জন্য ৩০ থেকে ৪৫ কার্যদিবস লাগলেও এক্ষেত্রে রেজিস্ট্রির মাত্র তিনদিনের মধ্যে নামপত্তন করে দিতে হয়েছে।
এর পরও কেন মন্ত্রী এমন অভিযোগ করলেন সে বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার শাহাজান আলী বলেন, সম্ভবত মন্ত্রীকে কেউ ভুল তথ্য সরবরাহ করেছে। সে কারণে হয়তো তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে মণিরামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের লোকজনের দাবি সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ওই অফিসে ঘুষ ছাড়া কাজ করা কঠিন। তার ছেলের দলিল করার জন্য ১০ দিন ঘুরতে হয়েছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে অসদাচরণও করা হয়।
অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের জের ধরে বৃহস্পতিবার সাতজনকে শোকজ করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন মহাপরিচালক (আইজিআর) শহিদুল ইসলাম ঝিনুক। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এর জবাব দিতে বলা হয়েছে। শোকজ নোটিসপ্রাপ্তরা হলেন যশোরের জেলা রেজিস্ট্রার মো. শাহজাহান সর্দার, মণিরামপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার শাহাজান আলী, মোহরার শামসুজ্জামান মিলন ও তরুণ কুমার, অফিস সহকারী শেখর চন্দ্র দে, পিওন সুশান্ত দাস ও দলিল লেখক কামরুজ্জামান।
এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. শাহজাহান সর্দার জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শোকজের জবাব পাঠানো হবে। তিনি বলেন, সমবায় প্রতিমন্ত্রী তাকে মণিরামপুরের মোহরার শামসুজ্জামান মিলনের বিরুদ্ধে অশোভন আচরণের অভিযোগ এনে বদলির জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বিষয়টি নিবন্ধন মহাপরিচালকের দপ্তরে লিখিতভাবে জানানোর পর বুধবারই মিলনকে বদলি করা হয়।
পরদিন যশোরের জেলা রেজিস্ট্রার ও মণিরামপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারসহ সাতজনকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় নিবন্ধন মহাপরিচালকের দপ্তর। এর আগের দিনই মণিরামপুর সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে মোহরার শামসুজ্জামান মিলনকে প্রত্যাহার করে বাঘারপাড়ায় বদলির আদেশ দেয়া হয়।