নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
বাবা মো. সোহেল আহমদ ছিলেন গাড়িচালক। পরীক্ষার চার দিন আগে গাড়ি চালোনো অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক করে আকস্মিক মারা যান তিনি। পরিবারের একমাত্র রোজগারে ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা অনেকটাই অনিশ্চিত ছিল। বাবার মৃত্যুশোক চেপে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সে। পরীক্ষার হলে বাবার জন্য কেঁদেছেও। এমন শোক-কাতরতার মধ্যেও পরীক্ষায় ফল করেছে ভালো। অর্জন করে জিপিএ-৫।
অদম্য এই মেধাবী সিলেটের আম্বরখানা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সুরাইয়া আক্তার জেরিন। এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
নগরীর আহসানিয়া নেহারিপাড়া এলাকায় বসবাস জেরিনের। বাবা মারা যাওয়ার পর সেসহ চার বোন আর মাকে নিয়ে পরিবার জেরিনের। সবার বড় হওয়ায় বাবা চলে যাবার পর সংসার চালানোর দায়িত্ব এসে পরে তার উপর। পরীক্ষা শেষ করেই সে নেমে পরে জীবন যুদ্ধে। পড়ালেখা ছাড়া আর তেমন কিছুই জানা নেই তার। তাই এই পড়ালেখাকে হাতিয়ার করে সামনে এগিয়ে চলার সিদ্ধান্ত নেয় জেরিন। শুরু করে টিউশনি। এই টিউশনি করেই বর্তমানে সংসার চালায় জেরিন। পাশাপাশি তার মা মোছা. শান্তা বেগম মাঝে মাঝে দর্জির কাজ করে সংসারে অর্থের যোগান দেন।
জেরিন জানায়, সে সিলেট বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে ৪ দশমিক ২২ পেয়ে এসএসসি পাস করে। আম্বরখানা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায়। এখন মেডিকেলে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে পড়ার অনেক ইচ্ছা তার। কিন্তু মেডিকেলে পড়তে হলে অনেক টাকার প্রয়োজন। সেই টাকার যোগান দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর পরিবারের নেই। তার উপর বাবা মারা যাওয়ায় সংসার চালানোর ভার এসে পড়েছে জেরিনের উপর। তাই সে ভাবছে নাসিংয়ে ভর্তি হতে।
সুরাইয়া আক্তার জেরিন বলে, পরীক্ষার চারদিন আগে বাবা মারা যান। আমি যে পরীক্ষা দিতে পারবো সেটাই ভাবিনি। তারপর প্রথম পরীক্ষা কোনো ভাবে দিয়ে আসলাম। বাবা হারানো শোক ছাড়ছিল না আমায়, তাই প্রথম পরীক্ষায় হলে অনেক কান্না করেছি। এরপর আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি ভাবিনি জিপিএ-৫ পাবো। ভাবছি হয়তো ভালভাবে পাশ করবো। তাই এখন পড়ার টান আরও বেড়ে গেছে।
মেডিকেলে ভর্তির ইচ্ছা থাকলেও মাথার ওপর বাবা নামের ছাতা নেই। জেরিন সেই ইচ্ছে বাদ দিয়ে সংসারের হাল ধরতে চায় দ্রুত। তাই নার্সিংয়ে ভর্তি হতে চায়।
জেরিন বলে, আমার তিনবোনও লেখাপড়া করছে। আমার এক বোন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আরেক বোন এসএসসি পরীক্ষা দিবে। আরেকজন নবম শ্রেণীতে পড়ে। তাদের পড়ালেখার খরচ, সংসার খরচ সব আমাকে দেখতে হবে। আমার জন্য যেন তাদের পড়া নষ্ট না হয় সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।