সিলেটটুডে ডেস্ক | ১২ এপ্রিল, ২০২২
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে হিন্দু পরিবারের বসতবাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেয়ার ঘটনায় স্থানীয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য। স্থানীয় যুবলীগ ও জামায়াত নেতার নেতৃত্বে এ হামলা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফেসবুকে ইসলাম ও মহানবীকে (সা.) অবমাননা করে স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগে সোমবার নিশানবাড়ীয়া ইউনিয়নের আমরবুনিয়া গ্রামে এক হিন্দু যুবকের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। বিতর্কিত পোস্ট দেয়ার অভিযোগে ওই যুবক কৌশিক বিশ্বাস পুলিশ হেফাজতে আছেন। এ ঘটনায় ১৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, ফেসবুকে একটি পুরোনো পোস্টকে কেন্দ্র করে এই হামলা হয়। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। হামলাকারী ও পোস্টাদাতা যুবকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ক্ষমা চাওয়ার পরেও হামলা
আমরবুনিয়া গ্রামে মোট ১১০ পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে হিন্দু পরিবার আছে ৫৪টি। গ্রামের কৃষক রমনী বিশ্বাসের চার ছেলেমেয়ের মধ্যে কৌশিক বিশ্বাস সবার বড়।
বাগেরহাট জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী পুলিশ পরিদর্শক এস এম আশরাফুল আলম মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, কৌশিক তিন বছর ধরে ভারতে আছেন। তিনি সেখানে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। এক সপ্তাহ আগে ভারত থেকে গ্রামের বাড়িতে আসেন কৌশিক। ভারতে থাকার সময় তিনি তার ফেসবুক আইডিতে বিতর্কিত পোস্টটি দেন।
ওই পোস্ট নিয়ে সোমবার বিকেল ৪টার দিকে স্থানীয় জিউধরা বাজারে একটি সালিশ বৈঠক হয়। বৈঠকে কৌশিক বিশ্বাস ও তার বাবা রমনী বিশ্বাস ক্ষমা চান। এ ধরনের কাজ আর করবেন না এবং তিনি (কৌশিক) কিছুদিন এলাকায় থাকবেন না বলেও অঙ্গীকার করেন।
তবে আমরবুনিয়া মসজিদের সেক্রেটারি জামায়াত সমর্থক নুরজামাল হাওলাদার, যুবলীগ সমর্থক পশ্চিম আমরবুনিয়া গ্রামের উজ্জ্বল খান এর বিরোধিতা করেন।
এলাকাবাসী জানান, সন্ধ্যা ৭টার দিকে কয়েকজন লোক মোটরসাইকেলে করে কৌশিকের বাড়িতে গিয়ে তাকে খোঁজাখুঁজি করেন। তখন স্থানীয় ইউপি সদস্য মালেক ফরাজি তাদের ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেন। কৌশিক ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে ঘেরে আত্মগোপন করেন।
এরপর মোরেলগঞ্জ থানা পুলিশ কৌশিককে হেফাজতে নেয়। তবে রাত ১০টার দিকে নুরজামাল হাওলাদার ও উজ্জ্বল খানের নেতৃত্বে ২৫০ থেকে ৩০০ লোক হঠাৎ মিছিল বের করে। ওই মিছিল থেকে কৌশিক বিশ্বাসের বাড়িঘর ভাঙচুর ও খড়ের গাদায় আগুন দেয়া হয়। এ ছাড়া বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে পারিবারিক মন্দিরে হামলা চালানো হয়। তবে ওই মন্দিরে কোনো প্রতিমা ছিল না।
একপর্যায়ে পুলিশ মিছিলকারীদের ধাওয়া করলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। বাগেরহাটের পুলিশ সুপার, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
আমরবুনিয়া গ্রামের রাকিব গাজী বলেন, ‘বিতর্কিত পোস্ট দেয়ার কারণে সালিশ বৈঠকে কৌশিককে মারধর করেন তারা বাবা রমনী বিশ্বাস। এর পর এ ধরনের কাজ আর না করার কথা জানিয়ে কৌশিক মুচলেকা দেন। তবে একটি পক্ষ এর বিরোধিতা করে বিভিন্ন মসজিদে খবর দেয়।
‘প্রায় ৭০০ মুসল্লি এদিন সন্ধ্যায় জড়ো হন। তখন পুলিশে খবর দেন স্থানীয়রা। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কৌশিকক নিজেদের হেফাজতে নেয়। এরপর কিছু পুলিশ তাকে নিয়ে থানার দিকে রওনা দেয়। তবে বাকি পুলিশের উপস্থিতিতেই কৌশিকদের বাড়ি ও মন্দিরে হামলা হয়।’
কৌশিকের মা লক্ষ্মী রানি বিশ্বাস বলেন, ‘ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার পর আমরা কিছুটা নিশ্চিন্তে ছিলাম যে আপাতত আর কিছু হবে না। তবে এর মধ্যে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে এসে লোকজন হামলা চালায়। ঘরে ঢুকে আমাদের পেটানো হয়। ছেলের বউকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়। পরে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে তারা চলে যায়।’
গ্রামের বাসিন্দা বিপুল মিস্ত্রি বলেন, ‘হামলায় নেতৃত্ব দেয়া উজ্জ্বল খানকে আমরা যুবলীগ নেতা হিসেবে চিনি। উনি (উজ্জ্বল) স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি হিসেবে নিজের পরিচয় দেন।’
রফিকুল ইসলাম নামে আরেক গ্রামবাসী বলেন, ‘উজ্বল খান ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। সোমবার মিছিল নিয়ে অন্যদের সঙ্গে তিনি এখানে এসেছিলেন। এ সময় সাবেক মেম্বার মালেক গাজী তাকে বাধা দেন। তবে বাধা উপেক্ষা করেই হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।’
তবে মোরেলগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হকের দাবি উজ্জ্বলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘উজ্জ্বল খান আমাদের সংগঠনের কেউ না। তার পরেও সংগঠনের কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
নিশানবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম বাচ্চু বলেন, ‘এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দিনমজুর। এলাকার মানুষ শান্তিপ্রিয়। এর আগে কখনও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।’
হামলায় জড়িতের কঠোর শাস্তি দাবি করে এই জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘অভিযুক্তরা পলাতক। ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক র্যাব ও পুলিশ সদস্য আছেন। ওই ঘটনায় হিন্দু পরিবারের লোকজন মনে কষ্ট পেয়েছেন।’
কৌশিক সম্পর্কে পুলিশের তথ্য
বাগেরহাট জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী পুলিশ পরিদর্শক এসএম আশরাফুল আলম জানান, কৌশিক বিশ্বাস অষ্টম শ্রেণি পাস। গেল ৩ বছর ভারতে ছিলেন। সেখানে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজিপি) সমর্থক কৌশিক গেল বছর দেশটির পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত পোস্ট দেয়ার অভিযোগে আইসিটি অ্যাক্টে করা মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ২৮ দিন জেলে থাকার পর তিনি ছাড়া পান।
বাড়ি পাচ্ছে কৌশকের পরিবার
কৌশিকের পরিবারকে নতুন ঘর করে দিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। ক্ষতিপূরণ হিসেবে এরই মধ্যে ২০ হাজার টাকা দেয়ার কথা জানিয়েছেন নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
ইউএনও জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও ঘর মেরামত করে দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ৬ বান্ডেল টিন দেয়া হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব মেরামত কাজ শেষ করা হবে।
জেলা পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে সেটা জঘন্যতম ও দুঃখজনক। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িওয়ালাকে আমরা আশ্বস্ত করছি যে, আপনারা নিশ্চিন্তে থাকেন। এর উপযুক্ত বিচার হবে।
‘যেটা নিয়ে রিউমার ছড়িয়েছে বা যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা আমরা তদন্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেব।’