Sylhet Today 24 PRINT

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বললেন প্রবৃদ্ধিতে চীনের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বাংলাদেশ

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

বাংলাদেশ এখন চীনের সঙ্গে 'নেক টু নেক' পাল্লা দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের আমন্ত্রণে ঢাকায় আসা এ অর্থনীতিবিদ রোববার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক গণবক্তৃতায় বলেন, বেশির ভাগ সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৬ শতাংশ। আর আগামী অর্থবছরে হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক ২০১৬ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের সমান ধরেছে। বাংলাদেশ এখন চীনের সঙ্গে 'নেক টু নেক' পাল্লা দিচ্ছে। ১০ বছর আগে এটি ছিল অচিন্ত্যনীয়।

পশ্চিমবঙ্গের এই বাঙালি অর্থনীতিবিদ বক্তৃতার শুরুতে খানিকটা বাংলায় বলতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, 'আমার খুবই ইচ্ছা করছে কিছু কথা বাংলায় বলতে। ২২ বছর পর ঢাকা এলাম। কলকাতায় মানুষ হয়েছি। আপনাদের মতো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকুমার রায় পড়ে বেড়ে উঠেছি।' তিনি বলেন, এবার এসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন খুবই চোখে পড়েছে। তবে উন্নয়নের কিছু সমস্যাও আছে, যেমন- ট্রাফিক জ্যাম। এবার ট্রাফিক জ্যামটা তার কাছে অনেক বেশি মনে হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। কৌশিক বসুর জীবনী তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল।

গণবক্তৃতার বিষয় ছিল 'বিশ্ব অর্থনীতি, বাংলাদেশ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা: সমস্যা ও সম্ভাবনা'। লিখিত বক্তৃতা ছাড়াই সাবলীলভাবে মাঝেমধ্যে গল্পের আশ্রয়ে জটিল এই বিষয়কে অত্যন্ত সহজভাবে উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা। অনেকের প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি।

কৌশিক বসু বলেন, চীন ৩০ বছর ধরে উৎপাদন খাতে গড়ে ১০ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এর অন্যতম কারণ, সস্তা শ্রম। এখন চীনে শ্রমের মূল্য বাড়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সামনে এখন বড় সুযোগ। বাংলাদেশের শ্রম তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা। চেষ্টা করলে বিশ্ববাজারে চীনের অংশীদারিত্বের একটি অংশ দখল করতে পারে বাংলাদেশ।

কৌশিক বসু বলেন, গত সাত-আট বছর ধরে বাংলাদেশ অনেক ভালো করছে। সঠিক নীতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারলে আরও ভালো করা সম্ভব। বাংলাদেশ হতে পারে এশিয়ার 'নতুন বাঘ'। পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ যেভাবে উন্নতি করেছে, বাংলাদেশের সেই সম্ভাবনা প্রবল। এ কোনো কল্পনাবিলাস নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা হলো ২০২০ সাল নাগাদ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করা। আমি মনে করি, ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আগামী তিন বছরের মধ্যেই সম্ভব।'

আঞ্চলিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে কৌশিক বসু বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে ভারতের দায়িত্ব বেশি। বাণিজ্য বাড়লে সবাই উপকৃত হবেন- এ কথা সব দেশকে বুঝতে হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ নাকি যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশের চলা উচিত- এমন প্রশ্নের জবাবে কৌশিক বসু বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষিত এবং দক্ষ মানুষ আছে। নিজেরা বসে আলোচনা করে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

২৩ বছরের তুলনা: কৌশিক বসু এর আগে ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৯২ সালে। ওই বছরকে বিবেচনায় নিয়ে গত ২৩ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতির তথ্য তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, এ সময়ে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ১৯৯২ সালে বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ১৭ শতাংশ। এখন ২৯ শতাংশ। রফতানি আয় তখন ছিল জিডিপির ৮ শতাংশ। আর এখন ২০ শতাংশ।

কৌশিক বসু বলেন, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ু ছিল ৬১ বছর। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭১ বছর। এ ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। ভারতে গড় আয়ু ৬৮ বছর। ভারতে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হারে বেড়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে। সামাজিক খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি অন্যদের জন্য অনুসরণীয়।

চ্যালেঞ্জও রয়েছে: কৌশিক বসু মনে করেন, বাংলাদেশ ভালো করছে। তবে আরও অনেকদূর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ জন্য নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। বাংলাদেশকে এখন অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের বিদ্যুৎ ও গ্যাস দিতে হবে। ভালো বন্দর সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়মকানুন সহজ করতে হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আয়বৈষম্য দূর করা বাংলাদেশ, ভারতসহ অনেক দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বৈষম্য দূর করতে কর আদায় পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বেশি হারে কর্মসংস্থান বাড়ানো। কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা।

জনভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে: কৌশিক বসু মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একটি ভালো নীতির জন্য দরকার ঐকান্তিক চেষ্টা। কেননা, ভালো নীতি প্রণীত হলে তার সুফল অনেক ব্যাপক। তবে সরকারকে মাথায় রাখতে হবে, জনসাধারণ অনেক বুদ্ধিমান। নীতি প্রণয়নে জনগণের ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজেন্ট দিয়ে গরিব মানুষকে সহায়তা দিতে গেলে অনেক সময় ফাঁকফোকর তৈরি হয়। এ কারণে সরকারি সহায়তা সরাসরি দেওয়া উচিত। নীতি ঠিকমতো না হলে দুর্নীতি হবে, সাধারণ লোকজন বঞ্চিত হবে। নীতি প্রণয়নে সাধারণ মানুষের চাওয়াকে কোনোভাবেই অবহেলা করা ঠিক নয়।

বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের নীতি: প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের জন্য অর্থায়নের নীতিতে বিশ্বব্যাংকে কোনো পরিবর্তন এনেছে কি না। এর উত্তরে কৌশিক বসু বলেন, বিশ্বব্যাংক চায়, বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্ত হোক এবং দেশের আয় যথার্থভাবে সবার মধ্যে বিতরণ হোক। তিনি বলেন, স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ভাবনা এ রকম যে, দীর্ঘ মেয়াদে যাতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট খাতে আর অর্থায়নের প্রয়োজন না হয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা: কৌশিক বসু গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেন। আর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিজার্ভ থেকে কিছু অর্থ অবকাঠামো উন্নয়নে খরচ করা যেতে পারে। তবে রিজার্ভ থেকে খরচের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা, ভালো রিজার্ভ পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইন্স্যুরেন্স হিসেবে কাজ করে। মুদ্রার বিনিময় হারে অস্বাভাবিকতা রোধ করতে সহায়তা করে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.