সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৫
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচারের প্রতিবাদে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠকে সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিন্ডিকেটের পর বিকেলে উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে এসব তথ্য জানান।
সিন্ডিকেট সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫ জন পাকিস্তানির বিচার করার জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। আর পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে সিন্ডিকেট সভা থেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মন্তব্য করায় এবং যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সদস্যপদ বাতিল করতে সিন্ডিকেট সার্ক ও জাতিসংঘের প্রতি অনুরোধ করেছে।
উপাচার্য বলেন, 'জরুরি সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুসারে আজ এই মুহূর্ত থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো; ইতোমধ্যে যেসব কর্মসূচি আছে যেমন- পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক বিনিময়, সমঝোতা স্মারক, সাংস্কৃতিক বিনিময়, স্পোর্টস, কোন ধরনের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।'
পাকিস্তান সরকার ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত সব ধরনের সম্পর্ক স্থগিত করা হলো বলে জানান তিনি।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে জরুরি সিন্ডিকেট সভায় উপস্থিত ছিলেন সিন্ডিকেট সদস্য ড. সহিদ আকতার হোসাইন, ড. নাসরীন আহমদ, অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল এবং সহকারী অধ্যাপক নীলিমা আক্তার প্রমুখ।
পরাজয় নিশ্চিত জেনে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের দোসরদের সহায়তায় পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকসহ দেশের মেধাবী সন্তানদের হত্যা করে। সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সোমবার শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে জাতি।
সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে উপাচার্য বলেন, 'একাত্তরে আজকের দিনে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা। এই হত্যার সবচেয়ে বড় আঘাত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘুমন্ত ছাত্র-শিক্ষকদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। অথচ পাকিস্তান সরকার বলেছে, ঢাকায় কোনো গণহত্যা হয়নি। এটা নির্লজ্জ মিথ্যাচার।'
এ প্রসঙ্গে ড. সিদ্দিক আরও বলেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা, বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমের আর্কাইভে গেলে পাকিস্তানের গণহত্যার প্রমাণ পাই। পাকিস্তানের এই মিথ্যাচারের পর তাদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক রাখা অসম্ভব।'
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে গত ২১ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরদিন এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ ঘটনা পাকিস্তানের জন্য 'উদ্বেগের ও যন্ত্রণার' বলে উল্লেখ করে। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করায় গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে তলব করে এর কড়া প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ। একইসঙ্গে তার হাতে আড়াই পৃষ্ঠার প্রতিবাদপত্র তুলে দেন ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মিজানুর রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ নভেম্বর পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে ডেকে গণহত্যার দায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দেশটি।
এরপর থেকেই মূলত পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি উঠে দেশের নানা মহল থেকে। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ ৭১, গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জোর দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ড. সিদ্দিক বলেন, 'একাত্তরের ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করে পাকিস্তান প্রথম দফা গণহত্যা চালিয়েছিল। এখন মিথ্যাচারের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান দ্বিতীয়বার গণহত্যা চালাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মিথ্যার সঙ্গে কোনো ধরনের আপোস করতে পারে না।'
এর আগে বিজয় দিবস সামনে রেখে ১ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা চত্বরে বিজয় শোভাযাত্রা সমাবেশে উপাচার্য ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র বা শিক্ষক প্রতিনিধি আগামীতে পাকিস্তানে যাবেন না।
ওই দিন উপাচার্য পাকিস্তানের সঙ্গে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে সরকারের কাছে দাবি জানানোর পাশাপাশি সার্কে তাদের সদস্যপদ বাতিল ও জাতিসংঘ থেকে 'সন্ত্রাসী রাষ্ট্র' পাকিস্তানকে বহিষ্কারে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
আবারও সরকারের প্রতি একই আহ্বান জানিয়ে উপাচার্য বলেন, 'যে পাকিস্তান স্বাধীনতা যুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছিল তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, কূটনৈতিক সম্পর্ক যেন না রাখা হয়। তাদের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। একইসঙ্গে পাকিস্তান একটা সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। জাতিসংঘ ও সার্কের সনদ অনুযায়ী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে জাতিসংঘ ও সার্ক থেকে বহিষ্কার করতে যথাযথ যে প্রক্রিয়া সেটা শুরু করতে হবে।'
এসময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন সদস্যকে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানান উপাচার্য। ইতোমধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের মরণোত্তর বিচারের আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ও ঢাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, 'আমরা শিগগিরই দেশের ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতারা বৈঠকে বসব। আশা করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগী হয়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করবে।'