সিলেটটুডে ডেস্ক | ০১ জুলাই, ২০২৩
ফাইল ছবি
গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের নৃশংস জঙ্গি হামলার সাত বছর পূর্তি আজ। এদিন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস জঙ্গি হামলায় ইতালির নয়জন, জাপানের সাতজন, ভারতীয় একজন ও বাংলাদেশি তিনজন নাগরিকসহ ২২ জনকে হত্যা করেছিল জঙ্গিরা।
এই হামলার ঘটনায় দায়ের মামলার রায়ও দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান রায়ে ৮ জঙ্গির মধ্যে সাত জনের ফাঁসির আদেশ দেন। মিজানুর রহমান নামে এক জঙ্গির সম্পৃক্ততা আদালতের যুক্তিতর্কে প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় বন্দুকধারী জঙ্গিরা। ওই দিন রাতেই তারা দেশি-বিদেশি মোট ২০ জনকে হত্যা করে। বিদেশি যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ইতালি, জাপান ও ভারতের নাগরিক। হামলার দিন উদ্ধার অভিযানের সময় বন্দুকধারীদের বোমায় নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। পরদিন সকালে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত হন পাঁচ হামলাকারী। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেক জঙ্গির মৃত্যু হয়।
হামলাকারী জঙ্গিরা হলেন— রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ।
জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটির মুখপত্র আমাক হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে বলে জানায় জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স।
এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ। মামলার পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিম ও কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ব্যবসায়ী শাহরিয়ার খানের ছেলে তাহমিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দুই দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে অবশ্য তাহমিদকে গুলশান মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে পুলিশকে অসহযোগিতার মামলা দেয় পুলিশ। সে মামলায় তাহমিদ ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত থেকে খালাস পান।
এ হামলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয় মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান, আবু রায়হান তারেক, সারোয়ার জাহান, আব্দুল্লাহ মোতালেব, ফরিদুল ইসলাম আকাশ, বাশারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান।
হলি আর্টিজানে হামলায় ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মোট ২১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। হামলার দুই বছর পর আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে ওই ২১ জনের নামই দেওয়া হয়। তবে ২১ জনের মধ্যে ১৩ জনই বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হন। ওই ১৩ জনের পাশাপাশি হাসনাত করিমকেও অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
ঘটনার প্রায় সাড়ে তিন বছর ও চার্জশিট জমা দেওয়ার প্রায় দেড় বছর পর ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে হলি আর্টিজান মামলার রায় হয়। রায়ে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন— গাইবান্ধার জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, নওগাঁর আসলাম হোসেন ওরফে আসলামুল ইসলাম ওরফে রাশেদ, কুষ্টিয়ার আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, জয়পুরহাটের হাদীসুর রহমান ওরফে সাগর, বগুড়ার রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও রাজশাহীর শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ। খালাস দেওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে।
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে ‘অন্যরকম’ পরিচিতি এনে দেয়। ওই হামলার পরপরই পশ্চিমা দূতাবাসগুলো এ দেশে ভ্রমণের ব্যাপারে তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করে। অবশ্য সন্ত্রাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া জোরালো উদ্যোগে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। সময়ের ব্যবধানে বিশ্ববাসী তাদের অবস্থানও বদলায়। বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণের ব্যাপারে কড়াকড়ি শিথিল করেছে।
ডেথ রেফারেন্স শুনানি চলছে উচ্চ আদালতে
আলোচিত এই জঙ্গি হামলার ঘটনায় নিম্ন আদালতের রায়ের চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত দোষীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অধস্তন আদালতের রায়ের পর এর ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরু হয়েছে উচ্চ আদালতে।
গত ১৪ মে উচ্চ আদালতে এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শুরু হয়।
বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ প্রথমে রায়ের অংশ পড়ে শোনান। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়।
সর্বশেষ ১৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয়। পরে দ্বিতীয় বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান হজ পালন করতে সৌদি আরব যান। আপাতত শুনানি থেমে আছে।
নিয়মানুযায়ী তিনি দেশে ফিরে যোগদান করলে ওই বেঞ্চেই ফের আলোচিত এই মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হবে।