সিলেটটুডে ডেস্ক | ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা জোনের এডিসি হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই নেতাকে থানায় ধরে নিয়ে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এদের মধ্যে একজনের দাঁত ভেঙে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ ঘটনায় এডিসি হারুনের বিচার দাবি করছেন সংগঠনটির সাবেক ও বর্তমান নেতা-কর্মীরা। যদিও মারধরের শিকার এই দুই নেতার একজন বলছেন ভিন্ন কথা।
গতকাল শনিবার রাতে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই ঘটনার সূত্রপাত। এরপর থেকে ছাত্রলীগের বর্তমান এবং সাবেক অনেক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এডিসি হারুনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছেন।
ভুক্তভোগী দুই নেতা হলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আনওয়ার হোসেন নাইম এবং বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক শরীফ আহমেদ মুনিম। এর মধ্যে আনওয়ার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্রলীগের সভাপতি আর মুনিম ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।
ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, এডিসি হারুন শনিবার রাতে এক নারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বারডেম হাসপাতালে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওই সময় নারী কর্মকর্তার স্বামী কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এই দুই নেতাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। নারী কর্মকর্তার স্বামীও একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি বর্তমানে রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ছিলেন। তার সঙ্গে এডিসি হারুনের বাকবিতণ্ডা হয়। পরে সেখানে বাকবিতণ্ডায় জড়ায় ওই দুই নেতাও।
এরপর এডিসি হারুন পুলিশ ফোর্স এনে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে শাহবাগ থানায় তুলে নিয়ে অমানসিক নির্যাতন করেন। এক পর্যায়ে তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়লে হাসপাতালে পাঠানো হয়। মারধরে মারাত্মক আহত হয়েছেন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আনওয়ার হোসেন নাইম। বর্তমানে তিনি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এদিকে এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শরিফ আহমেদ মুনিম বলেন, গতকাল রাত ৮টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। পিজি হাসপাতালে মামুন ভাইয়ের একজন রোগী ছিল। ওনাকে দেখতে আমরা সেখানে যাই। হারুন ভাই অফ ডিউটিতে ছিল আর ওনার গায়ে ইউনিফর্ম না থাকায় ওনাকে আমরা চিনতে পারিনি প্রথমে। ওনাদের সঙ্গে আমরাও লিফটে উঠি। তখন আমাদের মধ্যে ধাক্কা লাগে। মূলত হাসপাতালের লিফটে উঠাকে কেন্দ্র করে আমাদের সঙ্গে এডিসি হারুন ভাইয়ের কথা কাটাকাটি এবং পরে ধাক্কাধাক্কি হয়। এরপর শাহবাগ থানায় ঘটনার মিমাংসা হয়ে যায়।
আনওয়ার হোসেন নাইমের দাঁত ভাঙলো কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে হারুন ভাইয়ের সঙ্গে সিভিলে থাকা একজন হাতাহাতির এক পর্যায়ে নাইমকে ঘুষি মারেন। তখন নাইমের ঠোট ফেটে যায়।
মুনিম বলেন, আমরা নাকি বেশি ভাব দেখাইছি। এরপর আমাদের ওপর প্রথমে ওনারা হাত তুলেছে। পরে শাহবাগ থানায় মিমাংসা হয়ে যায়।
গতকাল রাত দশটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, শাহবাগ থানার গেট বন্ধ। কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। বাইরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা অবস্থান করছেন। ভেতরে ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান। গেটে থাকা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা ভেতরে অবস্থান করছেন।
এ ঘটনায় জানতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালীর ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে এই ঘটনার পর থেকে আনওয়ার হোসেন নাইমের ঠোট ফাটা, ঠোটে রক্ত আর দাঁত ভেঙে যাওয়ার একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ছাত্রলীগের বর্তমান এবং সাবেক নেতারা এডিসি হারুনের শাস্তি চেয়ে স্ট্যাটাস দেন।
এডিসি হারুনকে উদ্দেশ্য করে জাগরণ টিভির পরিচালক এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী বাণি ইয়াসমিন হাসি লিখেছেন, ‘তার কিছুই হবে না। বড় নেতার বন্ধু বলে কথা। বন্ধু কোটায় সে নাকি ছাত্রলীগের নেতা ছিল!’
আরেক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘মেরুদণ্ডহীন নেতৃত্ব। ছি:! লজ্জা! ১/১১ তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই দেখিয়েছিল। তখন অবশ্য ফেসবুকের যুগ ছিল না। আশা করব, বিপ্লবটা শুধু ফেসবুকে না করে সহকর্মীর রক্তের মর্যাদা দেবে তোমরা।’
এসব পোস্টে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী কমেন্ট করেছেন, ‘আপা, এর একটা বিহিত করতেই হবে! ও মানুষের পর্যায়ে পরে না, কথার আগে হাত-পা আর মুখে গালি চলে!! বারংবার অপরাধ করেও পার পাচ্ছে! আর সে কবে ছাত্রলীগ করছে, ছাত্রলীগের কোনো মিটিং-মিছিলে কোনোদিন দেখি নাই!’
প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন লিখেছেন, ‘আমাদের গাজীপুরের যে কয়টা ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, এর মধ্যে আনোয়ার হোসেন নাঈমকে আমরা বলি সবচেয়ে ভদ্র, মার্জিত ও মিষ্টি হাসির একটা ছেলে। সে কারো সঙ্গে বেয়াদবি করেছে কিংবা উচ্চস্বরে কথা বলেছে, এমন কথাও কেউ বলতে পারবে না।
নাঈম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক,এবং ফজলুল হক হল ছাত্রলীগের সভাপতি। একজন পুলিশ অফিসারের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তার ওপর যে অমানসিক নির্যাতন করা হয়েছে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। প্রতিবাদ করারও ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। পুলিশের ইমেজ নষ্ট করার জন্যই এইরকম একজন কর্মকর্তাই যথেষ্ট। নাঈমের জন্য শুভ কামনা..।’
সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী তিলোত্তমা শিকদার লিখেছেন ‘ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার। সব নিয়ে নীতি কী শুধু ছাত্রলীগের জন্য..? আমার ভাই নাঈম-মুনিমের পাশে আছি।’
সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী বেনজির হোসেন নিশি লিখেছেন, ‘এই ঘটনার পরও কীভাবে বসে থাকা সম্ভব? আমার ভাইয়ের বিচার আমি চাই, যেকোনো মূল্যে! এর জন্য সাবেক বর্তমান সবাই প্রয়োজনে এক হবো! তবু এর পাল্টা জবাব দেওয়াই চাই।’
ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুল হোসেন শান্ত লিখেন, ‘এডিসি হারুন একটা সন্ত্রাসী। ঢাকা কলেজের ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো, কনস্টেবলকে থাপ্পড় মারা, সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিক পেটানো আর আজ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই নেতার ওপর বর্বর অত্যাচার যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। হারুনের অব্যাহতি চাই।’