সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৩ জানুয়ারী, ২০১৬
এক ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসা ছাত্রদের দিনভর তাণ্ডবের পর সন্ধায় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর বুধবারের আহুত সকাল-সন্ধ্যা হরতাল প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গত সোমবার বিকেলে মোবাইল সেট কেনার মত একটি তুচ্ছ ঘটনা যাকে কেন্দ্র করে শহরে ব্যবসায়ী, ছাত্রলীগ ও পুলিশের ত্রিমুখি সংঘর্ষে আহত হওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার ৮ম শ্রেণীর ছাত্র মাসুদুর রহমানের ভোরে মারা গেলে বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক হরতাল ডেকে শহরজুড়ে তাণ্ডব চালায়।
মঙ্গলবারের (১২ জানুয়ারি) এই তাণ্ডবে তারা সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন ভাংচুরের পাশাপাশি তাঁর স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রও পুড়িয়ে দেয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম দাবি উত্থাপনকারী এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নামে যে ভাষা চত্বর; সেই চত্বরের ক্ষতিসাধন সহ নারকীয় এ তাণ্ডবলীলার মধ্যে ছিল জেলা শিল্পকলা একাডেমি, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমপ্লেক্সের ব্যাংক এশিয়া, প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র এবং জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়।
এদিকে, মাদ্রাসা ছাত্রদের এ তাণ্ডব এবং ঘোষিত হরতাল প্রত্যাহার করাতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মাদ্রাসার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মাহাবুবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ২ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে জামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মওলানা সাজিদুর রহমান হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। বৈঠকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার এম এ মাসুদ, ১২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নজরুল ইসলাম, র্যাব-১৪ এর অধিনায়কসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, সকালে কয়েকশ’ মাদ্রাসাছাত্র শহরের টিএ রোড, কুমারশীলের মোড়, লোকনাথ ট্যাঙ্কের পাড়সহ বেশ কয়েকটি স্থানে অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভের পর সাড়ে ১২টার দিকে ভাংচুর শুরু করে। মাদ্রাসা ছাত্ররা মিছিল করে শহরের কুমারশীল মোড় অতিক্রমের সময় ওই মিছিল থেকে কয়েকজন ‘ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ’ সংগীতাঙ্গনে আগুন দেয়। ঘণ্টাখানেক পর আগুন নিভে গেলে তারা ওই এলাকা ছাড়ে।
তাণ্ডবের অপর টার্গেট ছিল রেল স্টেশন। রেলের ফিসপ্লেট উঠিয়ে ফেলার পাশাপাশি হামলায় ক্ষয়-ক্ষতির কারণে সাড়ে ৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট রেল যোগাযোগ। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এএসপি তাপস রঞ্জন ঘোষ সাংবাদিকদের জানান, সোমবার বিকালে শহরের জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার এক ছাত্র মোবাইল ফোনসেট কেনার জন্য জেলা পরিষদ মার্কেটে যান। সেখানে দাম নিয়ে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে একপর্যায়ে দোকানি ওই ছাত্রকে চড় মারেন। এ খবর পেয়ে ওই মাদ্রাসার অর্ধশতাধিক ছাত্র দোকানটি ভাঙচুর করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে শুরু হয় সংঘর্ষ।
সংঘর্ষ চলাকালে শহরের বিভিন্ন স্থানে ৩০-৩৫টি হাতবোমা ফাটানো হয়। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ রবার বুলেট ও কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ে।
ওই সংঘর্ষে আহত মাদ্রাসাছাত্র মাসুদ মঙ্গলবার ভোরে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি পৌর শহরের ভাদুঘর এলাকার হাফেজ ইলিয়াস মিয়ার ছেলে।
এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ আহত মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যুর পর মাদ্রাসার সহপাঠীদের তাণ্ডবের ঘটনায় এএসপি তাপস রঞ্জন ঘোষ ও সদর মডেল থানার ওসি আকুল চন্দ্র বিশ্বাসকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।