সিলেটটুডে ডেস্ক

২৩ নভেম্বর, ২০২৩ ১৩:০৮

নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করলে পরিণতি ভালো হবে না: প্রধানমন্ত্রী

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করলে পরিণতি ভালো হবে না।

বৃহস্পতিবার (২৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের ঢাকা কার্যালয়ে মনোনয়ন বোর্ডের সভার আগে তিনি এ কথা বলেন।

বিএনপির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আওয়ামী লীগ সব সময় চায় গণতন্ত্র থাক। এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনভাবে তাদের কাজ করুক। আমরা সেই সুযোগটা তাদের দিয়েছি কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে আমরা পারিনি। আমাদের নিজেদের অফিসেই যেতে পারতাম না। এমনভাবে আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে, নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার করেছে। ২১ হাজার নেতাকর্মী হত্যা করেছে সারা বাংলাদেশে। গ্রেনেড হামলা, বোমা হামলা, জঙ্গিবাদ, ৬৩টা জেলায় বোমা হামলা, একদিনে ৫০০ বোমা হামলা, আমাদের বহু নেতাদের ওপর গ্রেনেড হামলা, বোমা হামলা।

'আর আমরা বেঁচে গেছি কীভাবে, সেটা বোধ হয় আল্লাহ বাঁচিয়েছে হাতে তুলে; যেভাবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করেছিল। তারপরও আমরা যখন সরকারে এসেছি, আজ পর্যন্ত আমরা তো তাদের ওপর এ ধরনের আক্রমণ করিনি! তারা অফিসে গেছে, পার্টি পরিচালনা করছে, তাদের যেভাবে মিটিং করার কথা, মিছিল করার কথা, তারা করে যাচ্ছে। কই আমরা তো বাধা দেই না! তাহলে এই অগ্নি সন্ত্রাস আবার কেন শুরু,' প্রশ্ন রাখেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, 'যখন বিএনপি মিছিল-মিটিং করছিল, ভদ্রভাবে রাজনীতি করছিল, তাদের ওপর মানুষের কিন্তু আস্থা ফিরে আসছিল। গ্রহণযোগ্যতা অনেকটা বেড়েছিল, এটা বাস্তব কথা। আমি জানি না, তারা এটা হিসাব করেছিল কি না। জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্য আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আমরা সব সময় সার্ভে করি, সব সময় খোঁজ নেই। প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর সারা বাংলাদেশে কার কী অবস্থান আমরা দেখি। তখন কিন্তু তারা মানুষের একটা সমর্থন পাচ্ছিল। জমায়েতও ভালো করছিল, অনেক টাকা-পয়সা করছিল এটা ঠিক কিন্তু জমায়েতও ভালো করছিল।'

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, 'যেই তারা আবার অগ্নি সন্ত্রাস শুরু করেছে, পুলিশ পিটিয়ে মেরেছে, মানুষ পিটিয়ে মেরেছে, মানুষের গায়ে আগুন দিয়েছে, বাসে আগুন দিয়েছে, ট্রেনে আগুন দিয়েছে, যখন এই অগ্নি সন্ত্রাস আর মানুষ খুন, বিচারপতির বাড়িতে হামলা করেছে, জজদের ওপর হামলা করেছে, সাংবাদিক-পুলিশ-আনসার-সাধারণ মানুষ; এদের ওপর যখন হামলা করতে শুরু করল আর পোড়াও-জ্বালাও শুরু করল, আবার তারা কিন্তু সেই আগের জায়গায় ফিরে গেছে। জনবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আবার তারা জনগণের কাছে চলে এসেছে। এই সন্ত্রাসী হিসেবে এখন আবার তারা পরিচয় পেয়েছে। তারা স্বরূপে এখন বিরাজমান।'

আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি বলেই বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে এবং উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। এটাকে ধ্বংস করার জন্য তাদের নানা প্রক্রিয়া। এখন রাজনৈতিকভাবে তারা পারেনি, এখন অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে চাপে ফেলবে সেই প্রচেষ্টা।

'তাদের...পৃথিবীর কিছু মোড়ল আছে, যেখানে তাদের সমর্থন সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হলেও সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন না, আরেক জায়গায় যদি হয় সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন। এ রকম দুমুখো—বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাটাকে নসাৎ করার একটা চক্রান্ত। আমি দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, আমরা বসছি, ইতোমধ্যে আমরা সার্ভে করেছি, রিপোর্ট নিয়েছি, আমরা নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী নির্বাচিত করব। নৌকা মার্কা বাংলার জনগণকে স্বাধীনতা দিয়েছে। নৌকা মার্কা যখন সরকারে এসেছে, তখন এ দেশের মানুষের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হয়েছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ গেছে, রাস্তা-ঘাট, পুল-ব্রিজ সব আমরা নির্মাণ করে মানুষকে একটা আধুনিক, উন্নত জীবন দেবার পদক্ষেপ নিয়েছি। অনেকটা আমরা সাফল্য অর্জন করেছি। আজকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি, ভবিষ্যতেও আমাদের এগিয়ে যাবার পালা। কাজেই নৌকা মার্কা থাকলে যে মানুষের জীবনে শান্তি থাকে, সমৃদ্ধি আসে, জীবন উন্নত হয়, এটাই হচ্ছে বাস্তবতা,' বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, 'নিশ্চয়ই দেশবাসী সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাদের প্রার্থী জয়যুক্ত করে তাদেরকে সেবা করার সুযোগ দেবেন। আর তা যদি না হয়, এই যে সন্ত্রাসী গ্রুপ—বিএনপি যে একটা সন্ত্রাসী দল এবং যারা দুর্নীতি; এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে, চোরাকারবারি, মানি লন্ডারিং, অস্ত্র চোরাকারবারি, অগ্নি সন্ত্রাসী, এরা আসলে তো দেশকে আবার খুবলে খাবে, দেশকে আবার পিছিয়ে দেবে। কারণ এরা মুক্তিযুদ্ধেও বিশ্বাস করে না, চেতনায় বিশ্বাস করে না, উন্নয়নেও বিশ্বাস করে না। নিজেদের ভাগ্য গড়ায় বিশ্বাস করে। নিজেরা অর্থ সম্পদ বানাতে পারে।'

তিনি বলেন, 'এখনো তাদের হরতাল-অবরোধ বন্ধ হয়নি। এর আগে যে হরতাল দিয়েছিল সেটাও কিন্তু এ পর্যন্ত অব্যাহত আছে। তার পরে আবার অবরোধ। কাজেই এই হরতাল-অবরোধ-অগ্নি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে। যেখানেই দেখবেন কেউ অগ্নি সন্ত্রাস করতে চেষ্টা করছে, বাসে-গাড়িতে যদি কেউ আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে সাথে সাথে তাদেরকে ধরতে হবে। সাথে সাথে ধরে তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে এবং পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। আমরা বলব না যে, আইন আপনার হাতে তুলে নিন কিন্তু এদেরকে ধরতে হবে এবং পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতে হবে।

'এ ব্যাপারে জনগণ যখন প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, ওদের ওই মুষ্ঠিমেয় সন্ত্রাসী চোরাগোপ্তা যাই করুক, ওগুলো আমরা ঠিকই তদন্ত করে ধরে ফেলব। যেখানেই ঘটনা ঘটবে, তার আশে পাশে প্রত্যেকটা বাড়ি সার্চ করে কোথায় কারা কেন করল, কারা টাকা দিলো, কারা এই আগুন লাগালো সবগুলো যাতে ধরা পড়ে সেই ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। ইতোমধ্যে কিন্তু যেখানে যেখানে করছে, আমরা ধরে ফেলছি এবং আমরা ধরে ফেলব। কেউ রেহাই পাবে না। এটা বাস্তবতা,' যোগ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'কোনো বড় দেশ; যে-ই তাদের সমর্থন দিক, আমার কাছে আমার বাংলাদেশ বড়। এর থেকে বড় আর কেউ না। আমি এখানে দেশের জন্য কাজ করি। কারও তাবেদারি করার জন্য না, কারও পদলেহন করার জন্য না।'

তিনি বলেন, 'আজকে বাংলাদেশের মানুষ বিশ্ব দরবারে তাদের মাথা উঁচু করে চলতে পারে। সেই সম্মান তারা পেয়েছে। আর এই সম্মান অক্ষুণ্ন রাখতে পারে একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে। কাজেই ওই সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদ, এদের ব্যাপারে সকলকে সচেতন হতে হবে।'

বিএনপির সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, 'তারা নির্বাচনে আসবে না। নির্বাচনে আসার মতো আসলে তাদের আস্থা-বিশ্বাস নাই। আর একটা দলের মাথা কোথায়? আমি জানি না, বিএনপি কি বাংলাদেশে একটা নেতাও পেল না? যাকে তাদের দলের চেয়ারম্যান করতে পারে। সাজাপ্রাপ্ত আসামি, তারেকের বিরুদ্ধে এফবিআই এসে সাক্ষী দিয়ে গেছে। খালেদা জিয়ার নাইকো কেইসে কানাডার পুলিশ এসে সাক্ষী দিয়ে গেছে। যারা এ রকম দুর্নীতিবাজ, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো হামলা ঘটাতে পারে—তাদের নেতৃত্বে যে দল; কোন বিশ্বাসে তারা ইলেকশনে আসবে!

'তারপরও আমি বলব, ঠিক আছে, দল যখন আছে আর কিছু না হোক নির্বাচনের নোমিনেশন বিক্রি করা, এটাও তো একটা ব্যবসা তাদের। এর আগে সে ব্যবসাই তারা করেছে। হয়তো সে ব্যবসা করতে পারে। সে জন্য নির্বাচনে আসুক, আমি সেটাই আহ্বান জানাই। নির্বাচনে আসেন, কার কত দৌড় আমরা সেটা দেখি। জনগণ কাকে চায় সেটা আমরা যাচাই করে দেখি,' বলেন তিনি।

যেসব দল ও জোট নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এটুকু বলতে পারি, এবারের নির্বাচন কেন—আওয়ামী লীগের আমলে প্রত্যেকটা নির্বাচন অবাধ-নিরপেক্ষ হয়। এবারে আমি বারবার নির্দেশও দিয়েছি, জনগণের ভোটের অধিকার আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো। এই অধিকারটা নিশ্চিত করেই আমরা নির্বাচন করব। এখানে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করব না। নির্বাচন কমিশন অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন করবে, সেটাই আমরা চাই।'

তিনি বলেন, 'নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা কেউ করবেন না। করলে সেটা ভালো হবে না। তার পরিণতিও ভালো হবে না। এটাও বাস্তবতা।'

শেখ হাসিনা আরও বলেন, 'যারা এখনো দ্বিধা দ্বন্দ্বে আছে, তাদেরও বলবো, আপনারা আসেন নির্বাচনে। অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা নিজেরাই আহ্বান করেছি, যদি পর্যবেক্ষক আসতে চায়—আসবে। আমাদের এখানে কোনো দ্বিধা নেই। কারণ আমাদের জনগণের ভোট চুরি করা লাগবে না। জনগণের আস্থা-বিশ্বাস আমাদের ওপর আছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সার্ভের রিপোর্টেও সেটা এসেছে।'

দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, 'আপনারা আপনাদের ভোটের অধিকার আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রয়োগ করবেন। যাকে খুশি তাকে ভোট দেন, আমাদের সে ব্যাপারে কোনো কথা নেই। আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে আমি আপনাদের কাছে দাবি করব আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দেন। কিন্তু সম্পূর্ণ জনগণের ইচ্ছা, ভোটারের ইচ্ছা; যাকে খুশি তাকে দিতে পারে। আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো, এটাই আমাদের স্লোগান। তারপরও আমি নৌকায় ভোট চেয়ে রাখলাম, কারণ এটা আমাকে চাইতেই হবে।'

আপনার মন্তব্য

আলোচিত