সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৬ আগস্ট, ২০২৪
দিনভর অবরুদ্ধ করার পর রাত ১০টার দিকে শিক্ষার্থীদের ধাওয়ার মুখে সচিবালয় এলাকা ছাড়ল চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনরত আনসার সদস্যরা। উভয়পক্ষের সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ অন্তত ৩৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহও রয়েছেন।
আন্দোলনরত আনসাররা রোববার (২৬ আগস্ট) দুপুর ১২টা থেকে সচিবালয় ঘেরাও করে রাখেন। ফলে সচিবালয়ের ভেতরে আটকা পড়েন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহসহ সচিবালয়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে সচিবালয়ে অবরুদ্ধ থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ তার ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে তাদের উদ্ধার করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সবাই রাজুতে আসেন। স্বৈরাচারী শক্তি আনসার হয়ে ফিরে আসতে চাচ্ছে। দাবি মানার পরও আমাদের সবাইকে সচিবালয়ে আটকে রাখা হয়েছে।’ এ খবর পেয়ে তাদের উদ্ধারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা লাঠিসোটা নিয়ে রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হয়ে সচিবালয়ের দিকে ছুটে যান।
রাত পৌনে ১০টার দিকে তারা সচিবালয় এলাকায় পৌঁছলে আন্দোলনরত আনসার সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়ার মুখে আন্দোলনকারী আনসার সদস্যরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে অবস্থান ছেড়ে চলে যান। কিছু আনসার সদস্য সচিবালয়ের ভেতর ও বাইরে বিভিন্ন জায়গায় আটকা পড়েন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। এরপর অবরুদ্ধ উপদেষ্টা, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা বের হয়ে যান।
এ সময় সচিবালয়ের গেটে সাংবাদিকদের উদ্দেশে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, আনসারদের সচিবালয় ঘেরাও ষড়যন্ত্রের অংশ, জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। প্রধান উপদেষ্টা আজ ঐক্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা আনসারদের সব দাবিদাওয়া মেনে নেব বলে আশ্বাস দিয়েছিলাম। এর জন্য আমরা সময় চেয়েছিলাম। কিন্তু এরপরও তারা সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে খবর পেয়ে ছাত্ররা তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, আজকে যারা এই চক্রান্ত করছে, তারা আনসার বাহিনীর সদস্য নয়, তারা চক্রান্তকারী। তাদের বিচারের জন্য যা করা লাগবে আমরা তা-ই করব। তারা যেহেতু আমাদের ভাইদের গায়ে হাত তুলেছে, তাদেরকে যেখান থেকে হোক খুঁজে বের করে ওই কালো হাতগুলো ভেঙে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব, সকলের দায়িত্ব। তাদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত ছাত্র-জনতা তাদের খোঁজে সব সময় সজাগ থাকবে।
সকাল ৮টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ শুরু করেন আনসার সদস্যরা। তাদের সমাবেশের কারণে তোপখানা রোড থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সড়ক বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এই সমাবেশে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসেন আনসার সদস্যরা। একপর্যায়ে তারা ছড়িয়ে পড়েন পুরো এলাকায়। ১২টার দিকে তারা সচিবালয় ঘেরাও করেন। এ সময় আন্দোলনরত আনসার সদস্যরা কয়েকবার বিদ্যুৎ ভবনের পাশের গেট দিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তাদের ঘেরাওয়ের কারণে সচিবালয় থেকে কেউ বের হতে বা প্রবেশ করতে পারেননি।
বিকালে আনসারদের কয়েকজন সমন্বয়কারীর সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। পরে সাধারণ আনসারদের বিশ্রামপ্রথা বাতিল করে দাবির বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে কমিটি গঠন করা হয়। সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ শুরু করেন আনসার সদস্যরা। গত দুদিন ধরে তাদের আন্দোলন আরও তীব্র হয়। শনিবার আনসার সদস্যদের দাবিদাওয়ার বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার নজরে আনা হয়। এর মধ্যে অন্যতম দাবি বিশ্রাম প্রথা বাতিল করা। বাতিলের আশ্বাস দিয়ে অন্যান্য দাবি সমাধানে যৌক্তিক উপায় বের করে একটি প্রতিবেদন দিতে আনসার মহাপরিচালকের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি না করার আহ্বান জানানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।
কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে আনসার সদস্যরা সচিবালয় ও আশপাশের এলাকায় অবরোধ অব্যাহত রাখেন। তাদের ভাষ্য, এখনই সব দাবি মেনে নিতে হবে। দাবি আদায়ে অনড় আনসার সদস্যদের ঘেরাওয়ের ফলে রাত পর্যন্ত সচিবালয়ের ভেতর থেকে বের হতে পারেননি কয়েকজন উপদেষ্টা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী।
সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল সকাল ১০টা থেকে আনসার সদস্যদের বিক্ষোভের কারণে গুলিস্তান শিশুপার্ক, মতিঝিল শাপলা চত্বর, কাকরাইল, মালিবাগ মৎস্য ভবন ও শাহবাগ, পল্টন, হাইকোর্ট মোড়, শান্তিনগরসহ সব এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। ফলে অনেক মানুষ কর্মস্থলেও ঠিকমতো পৌঁছতে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। আনসার সদস্যরা সকাল ৯টায় প্রথমে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তা অবরোধ করেন। এরপর হাইকোর্ট মোড়, সচিবালয়ের সামনের সড়ক ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেযন। এ সময় তারা অ্যাম্বুলেন্স, স্কুল-কলেজ বাস এবং সরকারি জরুরি সেবার গাড়িও চলাচল করতে দেননি।
এদিকে বিশ্রাম প্রথা বাতিল এবং কমিটি গঠন করে প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানানোর পর আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা আন্দোলন-কর্মসূচি স্থগিত করার ঘোষণা দেন। সমন্বয়করা আন্দোলনে থাকা সদস্যদের কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে কাজে যোগদানের নির্দেশনা দেন। তারপরও আন্দোলনকারী আনসার সদস্যরা চাকরি জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে অনড় থাকেন এবং রাতের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন দাবি করে সচিবালয়ের সামনে ঘেরাও কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। এতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।