সিলেটটুডে ডেস্ক | ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
সারাদিন প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শেষে রাতে ‘লীগ অ্যাক্টিভ হয়েছে’ এমন আওয়াজ দিয়ে সবাইকে নিরাপদে স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ নামের একটি সংগঠন।
সংগঠনটির মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি গত ডিসেম্বরে আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর ইনকিলাব মঞ্চ ব্যাপক আলোচনায় আসে। তারা হাদি হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলন করছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ১৩ মিনিটে ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজ থেকে বলা হয়, ‘লীগ অ্যাক্টিভ হয়েছে। তারা সাধারণ জনতার সাথে মিশে পরিস্থিতি অন্য দিকে প্রবাহের চেষ্টা করছে। শহিদ ওসমান হাদির হত্যার বিচার এবং নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চলছে। আপনাদের সবাইকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
এদিকে, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেছে তারা। এসময় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে শাহবাগে অবস্থান নেয় কিছু লোক। এ সময় ‘ব্লকেড, ব্লকেড, শাহবাগ ব্লকেড’; ‘হাদি তোমায় দেখা যায়, ইনকিলাবের পতাকায়’; ‘কে বলেরে হাদি নাই, হাদি সারা বাংলায়’; ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে’; ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’; ‘তুমি কে আমি কে, জাবির জাবির’; ‘বাংলাদেশের জনগণ, নেমে আসুন, নেমে পড়ুন’সহ নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে রাজু ভাস্কর্য থেকে একটি মিছিল নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। মিছিলটি শাহবাগে পৌঁছানোর পর তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা শাহবাগের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলসংলগ্ন সড়ক থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে। পাশাপাশি জলকামান ব্যবহার করা হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং কয়েক রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এ সময় পুলিশ ছররা গুলিও নিক্ষেপ করে।
এই সংঘর্ষে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হন বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ডাকসুর নেত্রী ফাতেমা তাসনিম জুমা, জকসুর নেত্রী শান্তা আক্তার, রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলেও জানানো হয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় কর্মসূচিতে গুলির ব্যবহার করা হয়নি।
ইনকিলাব মঞ্চের আহতদের কেউ গুলিবিদ্ধ নয় : ঢামেক পরিচালক
শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে অবস্থান করা ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। এ ঘটনায় আহত হয়ে প্রায় ৬০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কোনো গুলিবিদ্ধ বা পিলেট ইনজুরির রোগী পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টার দিকে এক ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি।
ঢামেক পরিচালক বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের যারা কর্মী ছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসেছেন। এখন পর্যন্ত আমরা ৬০ জনের মতো রোগী রিসিভ করেছি। এখনো রোগী আসছে। এই রোগীগুলোর মধ্যে ৩০ জন রোগী পেয়েছি, যাদের এক্সটারনাল ইনজুরি আছে। তবে কোনো গুলিবিদ্ধ অথবা পিলেটের রোগী পাইনি।
ঢামেক পরিচালক আরও বলেন, তাদের (আহতদের) স্কাল্প ইনজুরি, ফেস ইনজুরি, পায়ের ইনজুরি, এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ইনজুরি আছে, যেটা লাঠির আঘাতে হয়েছে। এ ছাড়া অনেকের ইনহেলেশন ইনজুরি আছে, যেটা টিয়ারসেলের কারণে হয়েছে। আমরা অক্সিজেন দিয়ে তাদের মোটামুটি সুস্থ করেছি। তবে কোনো রোগী আমরা এখনো ভর্তি করি নাই।
হাসপাতালের প্রস্তুতি সম্পর্কে পরিচালক বলেন, প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অনেক রোগী ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। তবে সমস্যা হলো, ক্রাউড কন্ট্রোল। আমাদের ২০০ চিকিৎসক উপস্থিত আছে, আমি নিজে উপস্থিত আছি। আমাদের চিকিৎসক, নার্সের কোনো স্বল্পতা নাই। ক্রাউড ম্যানেজ করা খুবই মুশকিল। কেউ কথা শুনতে চায় না; এটা একটা বড় সমস্যা।
পরিচালক বলেন, জরুরি বিভাগ আমরা বৃদ্ধি করেছি। যাতে আমরা ২৫ জন রোগী একসাথে চিকিৎসা দিতে পারি, সেটা কোনো সমস্যা না। কিন্তু সমস্যা হলো, এক রোগীর সাথে ১০ থেকে ১৫ জন চলে আসে। তখন দিতে সমস্যায় পড়তে হয়। আমরা চেষ্টা করছি এর মধ্যে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে। আমরা জুলাইয়ে অসংখ্য রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছি। আমাদের যে চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ রয়েছে চিকিৎসা দিতে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের অধীনে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। এ কারণে পুলিশ ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ের সামনে ব্যারিকেড স্থাপন করে।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ কয়েকজন যমুনার দিকে অগ্রসর হতে চাইলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। পরে যমুনার দিকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও পথে মারধরের অভিযোগ তুলে তাঁরা ফিরে আসেন।
এরপর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে অবস্থানরত ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীরা ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রথমে জলকামান থেকে পানি ছোড়ে। পরে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিপেটা করা হয়। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র ও ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হন। পরে তাঁদের অনেকেই ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন।
ঘটনার পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজ থেকে জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন; এমন দাবি করা হয়। তবে পুলিশ ও অন্তর্বর্তী সরকার উভয় পক্ষই এই দাবি অস্বীকার করেছে।
গত বছর ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তাঁকে মাথায় গুলি করার পর আততায়ীরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর মারা যান তিনি।