সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামকে সরিয়ে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামকে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা আমিনুল ইসলামকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই আদেশে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পাওয়া তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এদিন বিকালেই নতুন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন তাজুল ইসলাম।
তাজুল ইসলাম এরআগে একই ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইন পেশায় যোগ দেওয়ার আগ থেকেই তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পরে জামায়াত নেতাদের একাংশ যখন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি গঠন করে, তখন সেই দলের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। অবশ্য সদ্যবিলুপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আইসিটির চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পাওয়ার আগে তিনি এবি পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন।
তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিলের পর এর কারণ নিয়ে নানা মাধ্যমে আলোচনা চলছে। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে ‘রাজসাক্ষী বাণিজ্য’ ও ‘সেটলিং’ সিন্ডিকেটের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তার প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরাই তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনছেন।
প্রসিকিউশন টিমের সদস্য অ্যাডভোকেট বিএম সুলতান মাহমুদ সরাসরি সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘বাণিজ্য’ ও ‘রাজসাক্ষী নাটকের’ অভিযোগ তুলেছেন। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী বানানো নিয়ে ‘ট্রাইব্যুনালে ‘সেটলিং’ বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক সাজানোর অভিযোগ এনেছেন তিনি।
কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ শিরোনামে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেন প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ। ওই পোস্টে ‘প্রসিকিউশন টিমের একটি প্রভাবশালী অংশ গোপন সমঝোতা বা ‘সেটলিং’ বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে’ বলে অভিযোগ করা হয়। এদিকে তার ওই পোস্টের বক্তব্যের সঙ্গে সমর্থন জানিয়ে এবং আরও কিছু তথ্য তুলে ধরে অন্যান্য আইনজীবীদের মতোই মন্তব্য করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট বিএম সুলতান মাহমুদ।
প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ তার অভিযোগে বলেন, “আমি দীর্ঘদিন প্রসিকিউশন টিমে কাজ করছি। সেই কাজের সুবাদেই বলছি, শুধু আইজিপি মামুন নয়, আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলায় টাকার বিনিময়ে আফজালকেও রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। তিন চার জনের একটি সিন্ডিকেট শুরু থেকেই এই চক্রে জড়িত। ধানমন্ডি তদন্ত সংস্থায় বসে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির সিন্ডিকেট সাবেক আইজি মামুনকে রাজসাক্ষীর নাটক বানায়। সাবেক আইজিপি মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ধানমন্ডি তদন্ত সংস্থায় আনলে সেখানে শিশির মনির উপস্থিত থাকতো। তারা দাগি খুনি পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে নিরাপদে। চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে রেখেছে এই তাজুল সিন্ডিকেট।”
সুলতান মাহমুদ আরও বলেন, “গত বছর নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আফজালের বউ সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের রুমে প্রবেশ করে। বিষয়টি আমরা দেখার পরে সঙ্গে সঙ্গে তাজুল ইসলামের রুমে গিয়ে তাকে জানাই। এই ঘটনায় কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বরং উল্টো আমাদের বকাঝকা করে। তামিম তখন সবার সামনে স্বীকার করেছিলো যে, আফজালের বউ তার রুমে এসেছিল। চিফ প্রসিকিউটর শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন আসামির বউ কেন তার রুমে গিয়েছিল। শুধু এই জিজ্ঞাসা করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হলো। চূড়ান্ত বিচারে তাকে খালাস দেয়া হলো।”
তিনি বলেন, “চানখারপুলের মামলায় এসআই আশরাফুল গুলি করার নির্দেশনা দিচ্ছে এরকম ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পরও তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। সেই ভিডিও আমার কাছে আছে। রংপুরের আবু সাঈদের মামলায় এসি ইমরানকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এই ইমরানের নাম কয়েকজন সাক্ষীরা আদালতে এসে বলেছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের শেখ হাসিনার মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতো। কিন্তু সেটা না করে মামলা প্রতি ২-৪ জনকে আসামি করে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়ত করে জনগণকে ধোকা দেয়া হয়েছে। এগুলো চব্বিশের শহিদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি।”
অ্যাডভোকেট কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ পরে আরও এক পোস্টে লেখেন: বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় গত ২৪ মার্চ শহিদ পরিবারের সদস্যরা ট্রাইব্যুনালের সামনে বিক্ষোভ করতে বাধ্য হয়েছেন। সাড়ে সাত মাসেও যেখানে খুনিদের বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, সেখানে অপরাধীদের সাথে 'সেটলিং' এর খবর শহিদদের স্বজনদের মনে রক্তক্ষরণ বাড়াচ্ছে। আমাদের দাবি স্পষ্ট: ১. কেবল তাজুল ইসলামের অপসারণই যথেষ্ট নয়; আইজিপি মামুনকে রাজসাক্ষী বানানোর চেষ্টার পেছনে যে হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, তার উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। ২. ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। ৩. জুলাই গণহত্যার খুনিদের কোনো ক্ষমা বা রাজসাক্ষীর তকমা দেওয়া চলবে না—তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শহিদদের রক্তের সাথে কোনো আপস হতে পারে না। ট্রাইব্যুনালকে দুর্নীতির আখড়া বানানোর চেষ্টা রুখে দাঁড়াতে হবে।
যা বলছেন বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ বাতিলের পর সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকেরা তাজুল ইসলামকে প্রশ্ন করেন। তখন তিনি সব অভিযোগকে অস্বীকার করেন। সে সময় তাজুল ইসলামের পাশেই ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। তবে তামীম কোনো কথা বলেননি।
প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন তাজুল ইসলামকে। জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে হচ্ছে কে কী অভিযোগ করছে, এগুলো আমরা আমলে নিচ্ছি না। ব্যক্তিগতভাবে ক্ষোভ থেকে কে কী বলছে, সে ব্যাপারে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।’
তারপর আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ উনি স্পষ্টভাবে একটি অভিযোগ এনেছেন। এই তামীম সাহেবকে উদ্ধৃত করে যে ওনার (তামীম) রুমে এসআই আবজালুলের ওয়াইফ ভারী একটা ব্যাগ নিয়ে এসেছে। সেটা আপনাকে জানিয়েছে।’
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘না, এটা আমার জানা নেই।’
ওই সাংবাদিক আবার বলেন, ‘আপনাকে জানিয়েছে, সেটাও বলেছে।’
তখন তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই জাতীয় অভিযোগ আমরা তদন্ত করে দেখেছি, এগুলো সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা। ব্যক্তিগত হিংসা চরিতার্থ করার জন্য যদি কেউ এই ধরনের কথা বলেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ, এইখানে ট্রাইবুনালে বিচারপ্রক্রিয়াতে যা কিছু হয়েছে ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) এবং সেটা আদালতের মাধ্যমে কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং আজকে এই মুহূর্তে যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো মিথ্যা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের গোটা জনগণ সাক্ষী, মিডিয়া সাক্ষী। আপনারা জানেন যে কী ধরনের ট্রান্সপারেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। কারণ, দু–একজনের ব্যক্তিগত ক্ষোভের থেকে সে বুঝে হোক, না–বুঝে হোক যদি বলে, সেগুলোকে আমরা ধর্তব্যের মধ্যে মনে করি না।’
তাজুলের দুর্নীতি নিয়ে মন্তব্য করলেন না নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম
সদ্যবিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামসহ প্রসিকিউশনের দুজনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের আনা অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মনে করি যে এই জাতীয় বিষয় যদি আজকে আমাকে না বলেন, মনে হয় ভালো হবে। আজকের দিনটা আমাকে একটু অব্যাহতি দেবেন। কারণ, আজকে একেবারেই আমি আপনাদের মেহমান। প্রথম দিন। আমি এই কথাগুলো একেবারেই এখন নিতে চাচ্ছি না।…যে কথাগুলো বললেন, যদি এ রকম কিছু হয় নিশ্চয় আমার কাছে আসবে। তখন এগুলো দেখা যাবে। আজকে এই প্রশ্নগুলো না করি।’