Sylhet Today 24 PRINT

সরকার জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাইলফলক হলেও নতুন সরকারের সামনের পথ অত্যন্ত কঠিন। এই সরকারের প্রতি জনগণের শক্তিশালী সমর্থন বা ম্যান্ডেট রয়েছে। তবু বিএনপির অতীতের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশের অনেকের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে তা নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) প্রতিবেদনে এমনটিই বলা হয়েছে।

ক্রাইসিস গ্রুপ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ একটি অলাভজনক বৈশ্বিক বেসরকারি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে।

যুদ্ধ প্রতিরোধ ও আরো শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনে সহায়তা করা এই প্রতিষ্ঠানটি প্রাণঘাতী সংঘাত প্রতিরোধে সতর্কবার্তা দেয়। ক্রাইসিস গ্রুপ প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ তুলে ধরছে।

প্রতিবেদনে ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, নির্বাচনের পরে শুরুর এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি, সুশাসন এবং নিরাপত্তা খাত সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বিএনপির। ইরান সংঘাতের কারণে উদ্ভূত অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলা করা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে।

বিএনপির উচিত হবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করা।

ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন ছিল অনেকটাই শান্তিপূর্ণ। ওই নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভোট দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী শাসনের অবসান হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে—অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মোকাবেলা করা।

ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। সহিংসতায় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ভোটগ্রহণ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল এবং এর পাঁচ দিন পর ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।

ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সরকারের সামনে এখন ব্যাপক সংস্কারের জনপ্রত্যাশা পূরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মূলে থাকা বিরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে পরিবার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়া নেতিবাচক প্রভাব সামাল দেওয়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সরকার জনসমর্থন ধরে রাখতে চাইলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নও করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে রাজনৈতিক সংস্কারের একটি বড় অংশ বাস্তবায়ন এবং জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে।’

ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান হামলা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার কারণে।

ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, ‘বিএনপির জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের পর যে সীমিত সময়ের সুযোগ রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে বাংলাদেশের জনগণকে দেখানো যায় যে ক্ষমতায় ফিরে এসে তারা আগের চর্চায় ফিরে যাবে না।’

ক্রাইসিস গ্রুপের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘অনেক বাংলাদেশির কাছে এই নির্বাচনের গুরুত্ব কেবল ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো অর্থবহ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়াটাও ছিল বড় বিষয়।’

২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। ক্রাইসিস গ্রুপ বলছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তিনটি অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করেন। ওই নির্বাচনগুলো বিরোধী দলের বর্জন, ভোটারদের কম উপস্থিতি এবং ব্যাপক অনিয়মের জন্য সমালোচিত হয়েছিল। দেশের দুটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের একটি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলেও ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে অধিকাংশ ভোটার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দেশটি এখনো শেখ হাসিনার শাসনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে।

ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে জয়ী হয়েছে। এমনকি এই আসনগুলো পেতেও তাদের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়েছে। দেশের বৃহত্তম এই ইসলামপন্থী দলটি এবার তাদের ইতিহাসে সেরা নির্বাচনী ফলাফল করেছে। ‘জুলাই সনদের’ কোন বিধানগুলো শেষ পর্যন্ত বিএনপি বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, চূড়ান্ত নথিতে অন্তর্ভুক্ত কিছু সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের বিষয়ে দলটির আপত্তি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সামনের মাসগুলোতে অর্থনীতিকে সঠিক পথে রাখা। ইরান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি এমন একটি অর্থনীতির ওপর নতুন আঘাত হিসেবে আসবে, যা শেখ হাসিনার সরকারের আমলের অব্যবস্থাপনা থেকে এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলবে। একই সঙ্গে বিএনপিকে প্রশাসনিক সংস্কারে বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে, বিশেষ করে দুর্নীতি মোকাবেলা ও আইনের শাসন সুরক্ষিত করার মাধ্যমে। এর অংশ হিসেবে অধিকতর প্রশিক্ষিত ও কার্যকর পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলারও প্রয়োজন রয়েছে।

ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠন করা সামগ্রিকভাবে বিএনপি সরকারের জন্য একটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বৃহৎ প্রতিবেশী ওই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ ছিল আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাদের ব্যর্থতা। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল শুধু প্রচলিত পুলিশি কার্যক্রম নয়, বরং বারবার ঘটে যাওয়া সড়ক বিক্ষোভ ও জনতার সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা। এটি একদিকে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর, বিশেষ করে পুলিশের দুর্বল গ্রহণযোগ্যতা, যাদের অনেক বাংলাদেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত বলে মনে করে।

ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, স্বৈরাচার থেকে বেরিয়ে আসা অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে এ ধরনের অস্থিরতা কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। জনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নতুন সরকারকে সহিংস চরমপন্থার ঝুঁকির ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমপন্থী সংগঠনের সক্রিয়তার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। যদিও সরাসরি সহিংসতা এখনো তুলনামূলক কম, তবু অনলাইনে উগ্রবাদী বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটও তীব্র হতে পারে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.