সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৬ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের ঘটনাপঞ্জি ক্যামেরায় ধারণ করে যিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন, ভারতের সেই কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই।
ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে রোববার নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়; তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
দীর্ঘ ছয় দশকের ক্যারিয়ারে তিনি কেবল ক্যামেরায় ছবি তোলেননি, মানুষ আর সময়ের গল্পকে গ্রন্থিত করেছেন ইতিহাসের পাতায়।
ইনডিয়া টুডে রঘু রাইকে বর্ণনা করেছে ভারতের ফটোসাংবাদিকতা জগতের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে। পত্রিকাটি লিখেছে, এই আলোকচিত্রীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের কয়েক দশকের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল, রঘু রাই তখন ভারতের স্টেটসমেন্ট পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক। যে বিদেশি আলোকচিত্রীরা সে সময় মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন, তাদের মধ্যে প্রথম দিকেই রঘু রাইয়ের নাম আসে।
ভারতের বিভিন্ন শরণার্থীশিবির ঘুরে বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় দুর্দশার চিত্র ক্যামেরায় ধারণ করেন রঘু রাই। সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলা মানুষ আর রোগ-শোক অনাহারে ক্লিষ্ট শরণার্থীদের জীবনের সেইসব ছবি পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে ফেরা এবং রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যও ক্যামেরায় বন্দি করেছিলেন রঘু রাই। তার তোলা ছবিগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অমূল্য দলিল হয়ে আছে।
সেইসব শক্তিশালী আলোকচিত্রের জন্য ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৯২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন।
২০১৯ সালে আলোকচিত্র জগতের অন্যতম শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মান ‘অ্যাকাডেমি ডেস বিউক্স-আর্টস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’ পান রঘু রাই। ২০১৭ সালে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তাকে আজীবন সম্মাননা দেয়।
১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের ঝাং (বর্তমান পাকিস্তানে) অঞ্চলে জন্ম রঘু রাইয়ের জন্ম। পেশাজীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু পরে জীবিকা আর শিল্পের মাধ্যম হিসেবে ক্যামেরাকেই বেছে নেন।
২৩ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় আলোকচিত্রী হিসেবে তার যাত্রা শুরু। সেই পথ ধরে এক সময় তিনি বিশ্বজোড়া খ্যাতি পান।
স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবে দিল্লির ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় যোগ দিয়ে আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন রঘু রাই। ১৯৭৬ সালে তিনি পত্রিকার চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করেন।
১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ইন্ডিয়া টুডে’ ম্যাগাজিনের ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে তিনি ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’র জুরি মেম্বার ছিলেন।
ইনডিয়া টুডে লিখেছে, সাধারণ বিষয়ের মধ্যে ‘অসাধারণ’ কিছু খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা রঘু রাইকে করে তুলেছিল অনন্য। ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁক তিনি তার ক্যামেরায় ধারণ করেছেন।
বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসঁ ছিলেন রঘু রাইয়ের মেন্টর বা দীক্ষাগুরু। রাইয়ের কাজে মুগ্ধ হয়ে ব্রেসঁ ১৯৭৭ সালে তাকে ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এ যোগদানের সুপারিশ করেছিলেন। ম্যাগনাম বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আলোকচিত্র সংস্থা, যেখানে কেবল বিশ্বসেরা আলোকচিত্রীদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এনডিটিভি লিখেছে, রঘু রাইয়ের আলোকচিত্রকে আধুনিক ভারতের এক অনন্য ‘ভিজ্যুয়াল রেকর্ড’ বা প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয় ‘ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি’র পর তার তোলা ছবিগুলো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। পাশাপাশি তিনি খুব কাছ থেকে মাদার টেরিজা ও ইন্দিরা গান্ধীর মত প্রখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি তুলেছিলেন, যেগুলো ব্যাপক সমাদৃত হয়।
কেবল ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তও তার লেন্সে অনন্য হয়ে ধরা দিয়েছে। ভারতের রাস্তাঘাট আর গঙ্গা নদী নিয়ে তার তোলা ছবিগুলোও বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে।
আলোকচিত্র বিষয়ক লেখালেখিও তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। ‘রঘু রাই’স ইন্ডিয়া: রিফ্লেকশনস ইন কালার’ এবং ‘রিফ্লেকশনস ইন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ আলোকচিত্র নিয়ে তার ভাবনা ও দর্শণকে ধারণ করেছে।
রোববার পরিবারের পক্ষ থেকে রঘু রাইয়ের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে তার একটি সাদা-কালো প্রতিকৃতি পোস্ট করে মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করা হয়।
রঘু রাইয়ের ছেলে নীতিন রাই জানান, দুই বছর আগে তার বাবার প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়েছিল। সেখান থেকে তিনি সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু পরে ক্যানসার তার পাকস্থলীতে ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে নিতীন বলেন, "সম্প্রতি ক্যানসার তার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই সঙ্গে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতাও দেখা দেয়।"
মৃত্যুকালে স্ত্রী গুরমিত রাই এবং চার সন্তান নীতিন, লগন, অবনি ও পূর্বাইকে রেখে গেছেন। রোববার বিকালে দিল্লির লোধি রোড শ্মশানে তার শেষকৃত্য হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।