সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নতুন মাইলফলকের সামনে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যয়বহুল প্রকল্প পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়েই রূপপুর প্রকল্প উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করবে।
এদিন বিকেলে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হতে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আযাদ, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা-এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রেজানা গেছে, আজ জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধনের পর জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতেই প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি চলতি বছরের শেষ বা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারবে।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে। এর মাধ্যমেই ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিংয়ের পথ প্রশস্ত হয়।
পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎখাতের বিদ্যমান সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ দুই ইউনিট মিলিয়ে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যাত্রা শুরু
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ এ জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ২০১২ সালে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অ্যাক্ট পাস করা হয়। ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কাজের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশ পরমাণু ক্লাবের ৩৩তম সদস্য
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের মূল নির্মাণকাজ শুরুর (ফার্স্ট কংক্রিট পৌরিং বা এফসিপি) জন্য ‘ডিজাইন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লাইসেন্স’ পায় আণবিক শক্তি কমিশন (বিএইসি)। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ‘বিশ্ব পরমাণু ক্লাব’ (নিউক্লিয়ার নেশন)-এ যুক্ত হয়। বাংলাদেশ এই ক্লাবের ৩৩তম সদস্য। ২০১৮ সালের ৮ জুলাই রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি (বিএইআরএ) শর্তসাপেক্ষে এই লাইসেন্স দেয়।
দুই ইউনিটে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
উপজেলার পাকশীর রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরঘেঁষে নির্মিত রূপপুর প্রকল্পে ৩+প্রজন্মের দুটি ভিভিইআর রি-অ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটিতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি পাওয়ার ইউনিট থাকছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এখান থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করবে। রূপপুর প্রকল্পের জেনারেল ডিজাইনার এবং মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে রাশিয়ার রাষ্টীয় পরমাণু সংস্থা রসাটম। বাস্তবায়ন ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদি এবং গ্যাস, তেল ও কয়লার মতো জ্বালানি খরচ না থাকায় তুলনামূলক সস্তা হবে এই বিদ্যুৎ। এ প্রকল্পের ‘লাইফ’ বা জীবনীশক্তি হবে ৫০ বছর। তবে সংস্কার করে তা ৮০ বছর পর্যন্ত চলমান রাখা যাবে।
প্রকল্পের ব্যয়
রূপপুর প্রকল্পে নির্মিত হচ্ছে দুই ইউনিটের দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি এজেন্সি (আইএইএ) ও ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটি বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রত্যেকটি ধাপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই প্রকল্পে রাশিয়ার দেওয়া প্রকল্প ব্যয়ের ৯০ শতাংশ সরবরাহ ঋণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে মেগা প্রকল্প এটি। ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। ঋণ হিসাবে রাশিয়া দেবে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকারের ব্যয় হবে।