Sylhet Today 24 PRINT

বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আপিল বিভাগের রায় বৃহস্পতিবার

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০৮ জুলাই, ২০২৬

বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রায় ঘোষণা করবেন আপিল বিভাগ।

বুধবার (৮ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেন।

টানা তিন দিন শুনানি শেষে রায়ের জন্য আদালত এদিন ঠিক করলেন।

এদিকে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আপিল শুনানিতে পুরো সংশোধনীই বাতিল চেয়েছেন বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। গতকাল মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকালে আপিল বিভাগের শুনানি শেষে তিনি বলেন, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়ন করা হয়েছিল।

শুনানি শেষে বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আনতে গণভোটের প্রয়োজন ছিল, তা না করেই আনা হয়েছে এই সংশোধনী, এ কারণে এই সংশোধনী পুরটাই বাতিল চেয়েছি, এই সংশোধনী অবৈধ।

এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছিল তাই পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হওয়া উচিত বলে দাবি করেন তিনি। তবে, শুনানিতে তিনি ৯৬ ও ১০২ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা চান।

তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়ায় এই সংশোধনী সংসদে গৃহীত হয়, তা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। সংশোধনীর জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটিতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা রাখা হবে বলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সংসদে বিল উপস্থাপন করা হয়। এমনকি এ নিয়ে সংসদে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই এটি পাস হয়। সংসদে আলোচনা ছাড়াই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করা হয়েছে।

শরীফ ভূঁইয়া আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এর ফলে পরপর তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়। এতে করে দেশে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকের কথা বলার স্বাধীনতা ও সংবিধান বিষয়ে আলোচনা করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়াসহ মৌলিক অধিকার গুরুতরভাবে খর্ব করা হয়েছে।

এই সংশোধনী যে প্রক্রিয়ায় পাস হয়েছিল, তা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এটার মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা চালু করা হয়। দেশে কার্যত একটি একদলীয় শাসনব্যবস্থা তৈরি করার জন্য এই সংশোধনী করা হয়। কাজেই এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করা হয়েছে। এ কারণে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হওয়া উচিত, যোগ করেন এ আইনজীবী।

এদিকে, জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল না করে আংশিক বাতিলের প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে বিষয়গুলো সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভের সাথে সাংঘর্ষিক, কেবল সেগুলো বাতিল করা উচিত। এর বাইরে অন্যান্য নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত।’

তিনি আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক বা নীতিনির্ধারণী বিষয়ে আদালত হস্তক্ষেপ করলে তা ক্ষমতার পৃথক্‌করণ নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তার মতে, রাজনৈতিক বিতর্কগুলো সংসদের মাধ্যমেই মীমাংসা হওয়া উচিত। আদালত যদি ঢালাওভাবে সংশোধনীগুলো বাতিল করে, তবে তা দেশকে আবারও বাকশাল বা একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য কাম্য নয়।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৩ নভেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।

গত ৩ নভেম্বর হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। আপিলে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চাওয়া হয়েছে। রিটকারী সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এ আপিল দায়ের করেন।

গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে এনেছেন উচ্চ আদালত। তবে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল করা হয়নি এই রায়ে।

আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। এই গণতন্ত্র বিকশিত হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়নি। যার ফলে হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।

রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি–সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। পঞ্চদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল।

রায়ে আদালত বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে। এর মধ্যে জাতির পিতার স্বীকৃতির বিষয়, ২৬ মার্চের ভাষণের বিষয়গুলো রয়েছে।

গণভোটের বিষয়ে রায়ে হাইকোর্ট বলেন, গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়, যেটি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ ছিল। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হলো। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হলো।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.