সিলেটটুডে ডেস্ক | ২১ জুলাই, ২০২৬
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের তালিকা সরকারিভাবে যাচাই-বাছাইয়ের সময় ১৩ জন শহিদের তথ্য ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৮ জন আহত যোদ্ধার তথ্যও মিথ্যা বলে শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় মোট ২২১ জন জুলাইযোদ্ধার গেজেট বাতিল করা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের তথ্য মতে, মিথ্যা তথ্য, দ্বৈত নিবন্ধন এবং ভুয়া দাবির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণ হওয়ায় গত ১ জানুয়ারি থেকে শুরু করে কয়েক ধাপে এসব গেজেট বাতিল করা হয়।এ ছাড়া প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত ১২৮ জনের ভাতাসহ সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। নতুন করে প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া এবং আরও ৬০০টি আবেদনে গুরুতর অসংগতি শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে শতাধিক সন্দেহজনক আবেদন ও গেজেট এখনো তদন্তাধীন।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শহিদ পরিবার ও আহতদের কল্যাণে সরকার প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। এদিকে জুলাইযোদ্ধার তালিকাভুক্ত কার্যক্রমে এ ধরনের অনিয়ম ও প্রতারণার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকারের কল্যাণকর এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করছে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই, জবাবদিহি এবং প্রতারকদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থার ওপর।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আনোয়ারুল নাসের খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের স্বীকৃতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সুবিধা গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ৮৪৩ শহিদসহ মোট ১৪ হাজার ৩৭০ জন জুলাইযোদ্ধার গেজেট কার্যকর রয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কার্যকর গেজেটভুক্ত শহিদ ও জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা ১৫ হাজার ২১৩। এসব যোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের কল্যাণে এ পর্যন্ত ৩৮৩ কোটির বেশি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে এই তালিকা চূড়ান্ত করার আগে অভিযোগ ও ভুয়া তথ্য যাচাইয়ের কাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রতারণা বা জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত ১২৮ জন জুলাইযোদ্ধার ভাতাসহ সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে ১০৫ জনের ক্ষেত্রে আন্দোলনে আহত বা সম্পৃক্ত না থাকার প্রমাণ মিলেছে এবং ২৩ জনের নাম গেজেটে দুবার অন্তর্ভুক্ত করা ছিল। এসব ঘটনার পর তাদের গেজেট বাতিলের পাশাপাশি সরকারি সুবিধাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন আবেদনকারীদের মধ্যে পরিচালিত যাচাইয়ে প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া বলে শনাক্ত হয়েছে। আরও ৬০০টি আবেদনে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন, শহিদের পরিচয়ে আহত হিসেবে আবেদন, তথ্যগত গরমিল এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রে অসংগতি রয়েছে। এসব আবেদন নিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আনোয়ারুল নাসের বলেন, ‘প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের অধিকার নিশ্চিত করতে কোনো অনিয়ম বা প্রতারণার সঙ্গে আপস করা হবে না। অভিযোগ পাওয়া প্রতিটি ঘটনা জেলা-উপজেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে তদন্ত করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের গেজেট বাতিল ও সব ধরনের সরকারি সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়; বরং প্রকৃত অবদান রাখা ব্যক্তিদের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন যাচাই-বাছাই কমিটি স্থানীয়ভাবে তদন্ত করে আমাদের কাছে প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে। যেসব অভিযোগ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতারকদের বাদ দিয়েই প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।’
জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে মহাপরিচালক জানান, জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৮০৫টি শহিদ পরিবারের মধ্যে ২২২ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার সঞ্চয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটি শহিদ পরিবারের জন্য ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পারিবারিক জটিলতা ও আইনি বিরোধের কারণে অল্প কয়েকটি পরিবারকে এখনো এই সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৮৭০টি শহিদ পরিবারের ১ হাজার ২৭ জন উপকারভোগীকে মাসে ২০ হাজার টাকা হারে ১৮ কোটি ৪৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭০৯ টাকা ভাতা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আহত জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৪৫৯ জনকে ২১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা এককালীন অনুদান এবং ১৩ হাজার ৪৩৯ জনকে ১৬৯ কোটি ৩০ লাখ ১৯ হাজার টাকা মাসিক ভাতা প্রদান করা হয়েছে। ১৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আহত জুলাইযোদ্ধাদের ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জন চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন এবং ৫৪ জন এখনো চিকিৎসাধীন। দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছেন। শহিদ পরিবারের সঞ্চয়পত্র, শহিদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা, জুলাই যোদ্ধাদের এককালীন অনুদান এবং বিদেশে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত মোট ৯৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার ৯১৬ টাকা ব্যয় হয়েছে।
মহাপরিচালক জানান, আগামী ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে গণভবনে জুলাই জাদুঘরের উদ্বোধনের পাশাপাশি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হবে। একই দিন রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে চার শহিদ পরিবারকে এককালীন অনুদান প্রদান, নির্বাচিত জুলাইযোদ্ধাদের সম্মাননা এবং শহিদদের স্মরণে জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করে তারা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই শহিদ–রংপুরের আবু সাঈদ ও চট্টগ্রামের ওয়াসিমের স্মৃতি সংরক্ষণে আলাদা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রংপুরে আবু সাঈদের শহিদ হওয়ার স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের নকশা ও বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে, বাস্তবায়ন কার্যক্রমও এগিয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে চট্টগ্রামে শহিদ ওয়াসিম স্মরণে নির্মিতব্য স্মৃতিস্তম্ভের নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে এর নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে; নির্মাণ শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্য শহিদদের স্মৃতি সংরক্ষণে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সঞ্চয়পত্র পাওয়া শহিদ পরিবারের মধ্যে ৯৮০টি পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২২টি পরিবারকে ২০ থেকে ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৩১টি পরিবারকে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১৫ লাখ টাকা এবং ১০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। অবশিষ্ট শহিদ পরিবারের মধ্যে এখনো সঞ্চয়পত্র ও ভাতা বিতরণ করা সম্ভব হয়নি পারিবারিক ও অন্য জটিলতার কারণে। বিশেষ করে যশোরের জাবির হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ২৪ জনের পরিবারের বিষয়সহ কয়েকটি ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধ ও অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। এসব জটিলতা নিষ্পত্তি হলে সংশ্লিষ্ট শহিদ পরিবারের মধ্যে সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতা দেওয়া হবে।
অন্যদিকে প্রতারণার মাধ্যমে জুলাই শহিদ হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া ১৩ জনের গেজেট বাতিল এবং তালিকাভুক্ত আরও শতাধিক ‘জুলাইযোদ্ধা’র ব্যাপারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী মিথ্যা তথ্য প্রদান, তথ্য গোপন বা ভুয়া নথি ব্যবহার করে সরকারি সুবিধা গ্রহণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা অবৈধভাবে গ্রহণ করা সরকারি সুবিধার দ্বিগুণ অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে। পাশাপাশি প্রতারণার মাধ্যমে পাওয়া গেজেট, স্বীকৃতি ও সব ধরনের সরকারি সুবিধা বাতিল এবং আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধারেরও বিধান রাখা হয়েছে।
সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শহিদ পরিবার ও আহতদের জন্য সরকারের কল্যাণমূলক কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। তবে এত বড় আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিতে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রতারণা পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই প্রকৃত উপকারভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সুবিধা গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে আইনে নির্ধারিত ব্যবস্থা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম কমবে এবং জনগণের আস্থাও আরও সুদৃঢ় হবে।