সিলেটটুডে ডেস্ক | ০৪ আগস্ট, ২০২৬
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের দুই বছর পর নাগরিক স্বাধীনতার সুযোগ ফের সংকুচিত ও হুমকির মুখে পড়েছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘সিভিকাস’।
বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষা ও মানবাধিকারবিষয়ক সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
সংস্থাটি জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যেসব মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান সরকার। উল্টো আন্দোলন-পরবর্তী অর্জিত প্রগতিশীল পদক্ষেপগুলোকে পেছনে টেনে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সিভিকাসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে দেশে স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং নাগরিক আন্দোলন বা অ্যাক্টিভিজম পরিচালনার সুযোগ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয়—উভয় পক্ষের প্রতিশোধের ভয়ে অনেক মানবাধিকার কর্মী ও স্বাধীন মতপ্রকাশকারী বাধ্য হয়ে চুপ হয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিগত সরকারের আমলে ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত পুলিশ বাহিনী এবং বিতর্কিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর মতো সংস্থায় কোনো অর্থবহ সংস্কার আনা হয়নি। একই সঙ্গে স্বাধীন সুশীল সমাজ ও সমালোচক সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতেও কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার চিত্রও উদ্বেগের বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) আওতায় ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর মতো অস্পষ্ট ও ভিত্তিহীন অভিযোগে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও আটক করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইন সমালোচকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং সরকার ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’ ব্যবহার করে অনলাইনের ভিন্নমত দমনকে আরও অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে বলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সিভিকাসের এশিয়া অঞ্চলের অ্যাডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন অফিসার রাজভেলু কারুনানিধি বলেন: "২০২৪ সালের আন্দোলনের পর জনগণের পক্ষ থেকে মানবাধিকার বিষয়ক যে সংস্কারের দাবি উঠেছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সুপারিশ করেছিল, তা বাস্তবায়নে বিএনপি সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আন্দোলন-পরবর্তী প্রগতিশীল পরিবর্তনগুলোকে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা দেখতে পাচ্ছি, যা ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারের পরিপন্থী।"
সংস্থাটি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) অধ্যাদেশ পাস না করে সরকার একটি দুর্বল বিল উপস্থাপন করেছে। এই খসড়া বিলটি আন্তর্জাতিক 'প্যারিস নীতি'-র পরিপন্থী এবং এটি কমিশনকে সীমিত ক্ষমতার এক নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে না।
এ ছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত ‘গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’-এর সুপারিশগুলোর ওপরও বর্তমান সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যখন বিচার ও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, তখন ২০২৬ সালের জুলাই মাসে গত দুই বছরের মধ্যে প্রথম নতুন করে গুমের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
রাজভেলু কারুনানিধি আরও যোগ করেন: "প্যারিস নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে একটি স্বাধীন ও কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে।"