সিলেটটুডে ডেস্ক | ০৪ আগস্ট, ২০২৬
নেত্রকোনা সদর উপজেলায় এক স্কুলছাত্রীকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় না গিয়ে বিএনপির স্থানীয় কার্যালয়ে সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করা হয়েছে। তাঁকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি এলাকাছাড়া করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সালিসের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পেশায় কাঠমিস্ত্রি রিপন মিয়া ২০১৬ সাল থেকে ফেসবুকে ভিডিও তৈরি করছেন। ‘হাই আই এম রিপন ভিডিও’ ও ‘আই লাভ ইউ, এটাই বাস্তব’—এসব সংলাপের ভিডিও দিয়ে তিনি পরিচিতি পান। ২০১৯ সালে ‘রিপন মিয়া’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলেন। পেজটিতে বর্তমানে ফলোয়ারের সংখ্যা ১৯ লাখ।
ওই কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, গত শনিবার রাত আটটার দিকে তাদের বাড়িতে যান রিপন। তখন ওই স্কুলছাত্রী বাড়ির উঠানে রান্না করছিল। তার বাবা স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকানে ও মা বাইরে কাজে ছিলেন। এ সুযোগে ওই ছাত্রীকে জোর করে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন রিপন। পরে মেয়েটির চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে রিপন পালিয়ে যান।
পরিবারটির দাবি, ভিডিও বানানোর কথা বলে রিপন আগে থেকেই কিশোরীটিকে উত্ত্যক্ত করতেন। লোকলজ্জার ভয়ে পরিবারটি প্রথমে বিষয়টি প্রকাশ করেনি। পরে ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে সোমবার রাতে স্থানীয় একটি বাজারে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে সালিস বসে।
সালিসে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ওই বৈঠক হয়। সেখানে স্থানীয় বিএনপি–জামায়াতের নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রিপন অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চান। পরে তাঁকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং এলাকাছাড়া করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সালিসের কয়েকটি ভিডিও মঙ্গলবার সকালে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযোগ স্বীকার করে উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা চাইছেন রিপন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ভুল করলেও করছি, না করলেও করছি। আমি, আফনেরার লগে থাহন লাগবো...! ভুল তো মানুষ করেই, আমি একটা ভুল কইরাইলছি।’ কথার এক পর্যায়ে তিনি মাফ চাওয়ার জন্য ফজলুর রহমানের পায়ে ধরেন।
ভিডিওগুলো নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধের বিচার গ্রাম্য সালিসে করাকে আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক (উত্তরাঞ্চল) প্রীতম সোহাগ ফেসবুকে লিখেছেন, ধর্ষণের মতো অভিযোগের বিচার আইন অনুযায়ী পুলিশ ও আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত। দলীয় কার্যালয়ে বসে এমন ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার চেষ্টা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল এবং এটি নিন্দনীয়।
এ বিষয়ে জানতে রিপন মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ায় তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন।
ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের বিকেলে বলেন, ‘মেয়েটি দরিদ্র পরিবারের। বিষয়টি জানার পর মেয়েটির পরিবার ও গ্রামের লোকজন আমাদের কাছে বিচার নিয়ে আসে। পরিবারের মামলা চালানোর সামর্থ্যও নেই। পরে আমরা এলাকাবাসী মিলে সালিসে বসেছিলাম। তারপর বলেছি আইনি পদক্ষেপ নিতে। সালিসের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন পুলিশ এসেছে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে জানিয়ে নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, অভিযোগ দেওয়ার জন্য মেয়েটিকে পরিবারের সঙ্গে থানায় পাঠানো হয়েছে। সালিসে থাকা দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অভিযুক্ত রিপনকেও আটকের চেষ্টা চলছে।