নিজস্ব প্রতিবেদক | ১১ আগস্ট, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
চব্বিশের আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে গড়ে তোলা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে’ আন্দোলনকারীদের নানা ঘটনার ভাস্কর্য ও মূর্তি স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে দেশের আলেম সমাজে। ইসলামি শরিয়তের বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে জাদুঘর থেকে এসব ভাস্কর্য দ্রুত অপসারণের দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদসহ একাধিক ইসলামি সংগঠন ও চিন্তাবিদ।
তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সম্পূর্ণ অপসারণের পরিবর্তে ভাস্কর্যের মুখাবয়ব মুছে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনকে রূপান্তর করে নির্মিত এই জাদুঘরের কাজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে শুরু হলেও, সম্প্রতি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টাকে সঙ্গে নিয়ে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্দোলনের স্মৃতিকে দৃশ্যমান করতে এতে স্থাপন করা হয়েছে একাধিক মূর্তি ও ভাস্কর্য, যা নিয়ে আলেম সমাজের মধ্যে দ্বিমত তৈরি হয়েছে।
গতকাল সোমবার (১০ আগস্ট) এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনের আমির শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, “যারা জীবনভর ইসলামের আকিদা, ঈমান ও ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার লড়াইতে প্রাতঃস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন, তাদের স্মৃতি রক্ষার অজুহাতে ভাস্কর্য বানিয়ে ইসলামী বিধানের চরম বরখেলাপ করা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। যে আলেম সমাজ অতীতে এ ভাস্কর্য ও মূর্তি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন ও কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন, আজ স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে তাদেরই অবয়বে ভাস্কর্য বানিয়ে অপমান করা হচ্ছে—এটি একটি চরম মর্মান্তিক ও নজিরবিহীন বৈপরীত্য।”
বিবৃতিতে তারা ইতিহাস সংরক্ষণে ভাস্কর্যের বিকল্প হিসেবে প্রামাণ্য দলিলপত্র প্রদর্শন এবং ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের সত্য ইতিহাস জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
হেফাজত নেতারা আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, মহানবী (সা.)-এর সাহাবিদের কোনো ভাস্কর্য ছিল না। কিন্তু তাদের আদর্শ আজও বিশ্বজুড়ে আলো ছড়াচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কোনো প্রকার গড়িমসি না করে জুলাই জাদুঘর থেকে এ ভাস্কর্যগুলো অনতিবিলম্বে অপসারণের জোর দাবি জানানো হচ্ছে। অন্যথায় আলেম সমাজ তাদের নীতি ও আকিদা রক্ষায় নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।
একই সুর ফুটে উঠেছে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের সভাপতি ও হেফাজতের নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরীর (পীর সাহেব দেওনা) বক্তব্যে। তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা ইসলামি দলের নেতাকর্মী- পরিচয় যা-ই হোক না কেন, তাদের ভাস্কর্য নির্মাণ ইসলামি শরিয়ার দৃষ্টিতে বৈধ নয়। ইসলামের বিধান সবার জন্য সমান। কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, অবদান কিংবা রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পরিচয়ের কারণে শরিয়ার বিধান পরিবর্তিত হতে পারে না।”
শহিদদের স্মৃতি রক্ষায় ভাস্কর্যের বদলে তথ্যচিত্র, আলোকচিত্র ও লিখিত দলিল প্রদর্শনের পরামর্শ দেন তিনি এবং পাঠ্যপুস্তকে ভাস্কর্যের ছবি অন্তর্ভুক্ত না করার হুঁশিয়ারি জানান।
ভাস্কর্য অপসারণের দাবি জানিয়ে পীর সাহেব দেওনা বলেন, “জুলাই জাদুঘরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের নামে বা অবয়বে যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। যারা ইসলামি মূল্যবোধ, আকিদা ও শরিয়ার পক্ষে কথা বলেন, তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের নামেও এমন কিছু করা উচিত নয়, যা ইসলামি বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
বিষয়টি নিয়ে জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজিরবাজার সিলেটের ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা সামীউর রহমান মুসা বলেন, “ভাস্কর্য যারই হোক, যে নামেই নির্মিত হোক, তা শিরকি। ইসলামের দৃষ্টিতে তা কোনোভাবেই বৈধ নয়।”
ধর্মীয় বক্তা রফিকুল ইসলাম মাদানী জুলাই জাদুঘরের ভাস্কর্য নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, “এই ভাস্কর্যগুলো করানো হয়েছে হেফাজতকে সমালোচিত করতে। না হয় শাপলাকে স্মরণীয় রাখার নামে ভাস্কর্য করতে হেফাজতের কেউ কি বলেছে? তাহলে কেনো করা হলো? কিছু কুকুরের ঘেউ ঘেউ করার সুবিধা হয়েছে। হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা অনতিবিলম্বে সরকারের কাছে আহ্বান করুন এই ভাস্কর্য ভেঙে দিত। না হয় আমরা ছোটরা কিন্তু যে কোনো দিন জুলাই জাদুঘরে গিয়ে এগুলো নিজ হাতে ভেঙে দিয়ে আসব। যা হারাম, তা শেখ মুজিবেরটাও হারাম, আমার বাবার হলেও হারাম। লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার।”
আলেম সমাজের একাধিক সংগঠন যখন ভাস্কর্য অপসারণের দাবি জানাচ্ছে, তখন কিছুটা মধ্যপন্থার দিকে এগোলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। গত ৯ আগস্ট জাদুঘর পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদের সময়ে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গিয়েছি— সেটি হলো ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় মুসলিম সংস্কৃতি ও মূল্যবোধবিরোধী মানুষের ভাস্কর্য থাকতে পারে না। সে জায়গা থেকে শাপলা চত্বরের শহিদদের মুখাবয়ব বাদ দিয়ে তাদের স্মৃতি ও ঘটনাকে চিত্রিত করার পরামর্শ দিচ্ছি।”