Sylhet Today 24 PRINT

দুদক চেয়ারম্যান পদে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ নিয়ে প্রশ্ন

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ১৯ আগস্ট, ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদ সাড়ে পাঁচ মাস খালি থাকার পর সেখানে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার।

গত সোমবার রাতে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। কমিশনার হিসেবে জাহাঙ্গীর আলম খান ও মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

দুদকের চেয়ারম্যান পদে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মাধ্যমে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সংবিধানবিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, এই নিয়োগ সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের রাষ্ট্রের লাভজনক পদে নিয়োগে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সংবিধানবিশেষজ্ঞ রিদওয়ানুল হক গতকাল মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার লঙ্ঘন’ শিরোনামে লিখেছেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক বিচারপতিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া একটি অসাংবিধানিক পদক্ষেপ। কারণ, এটি সরাসরি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘কয়েক বছর আগের অনুরূপ একটি নিয়োগ সম্পর্কে আমার জানা আছে। বর্তমান সরকার স্পষ্টতই গণতন্ত্রের বিপরীত পথে রয়েছে...।’

আইনজ্ঞরা বলছেন, দুদক কোনো বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান নয়। একইভাবে এর চেয়ারম্যানও বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় কোনো পদ নয়। এ কারণেই দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অবসর গ্রহণের পর উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা কোন ধরনের কর্মে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না, তা ‘অবসর গ্রহণের পর বিচারকগণের অক্ষমতা’ উপশিরোনামে সংবিধানের ৯৯(১) ও ৯৯(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে।

সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদের (১) দফায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত (অস্থায়ী) বিচারক ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা অবসর বা অপসারণের পর আইন পেশায় নিয়োজিত হতে পারবেন না এবং বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় পদ ছাড়া প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।

৯৯(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (১) দফায় যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক পদে বহাল থাকলে উক্ত পদ হতে অবসর গ্রহণের পর তিনি আপিল বিভাগে ওকালতি করতে পারবেন।

এর মানে হলো সংবিধান অনুযায়ী আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় পদ ছাড়া প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

আইনজ্ঞরা বলছেন, দুদক কোনো বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান নয়। একইভাবে এর চেয়ারম্যানও বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় কোনো পদ নয়। এ কারণেই দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে স্থায়ী হন তিনি। গত বছরের ২৫ মার্চ আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসরে যান তিনি।

একজন সাবেক বিচারপতিকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, দুদক চেয়ারম্যানের পদ স্পষ্টতই একটি লাভজনক পদ। এটি বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় কোনো পদ নয়। তাই আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

শরীফ ভূঁইয়া বলেন, আগেও একই রকম নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। তখন ওই নিয়োগকে অসাংবিধানিক বা অবৈধ ঘোষণার জন্য হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছিল। ২০০৬ সালে আদালত রিটটি খারিজ করে দেন। তিনি বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে আদালতের ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

বিএনপি সরকার তার আগের মেয়াদে (২০০১-০৬) হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি সুলতান হোসেন খানকে দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। সেই সময়েও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তার নিয়োগ নিয়েই আদালতে রিট হয়েছিল।

এদিকে দুদক আইনে বলা হয়েছে, ‘আইনে, শিক্ষায়, প্রশাসনে, বিচারে বা শৃঙ্খলা বাহিনীতে অন্যূন ২০ বৎসরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি কমিশনার হইবার যোগ্য হইবেন।’ অর্থাৎ দুদকে সাবেক বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া যাবে। অবশ্য সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানে যেখানে বিধিনিষেধ রয়েছে, সেখানে দুদক আইন প্রযোজ্য হবে না।

দুদকে নিয়োগের জন্য গত ২২ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে সূত্রের মাধ্যমে জানা গিয়েছিল, সেখানে ৪০টি আবেদন জমা পড়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত কয়টি আবেদন জমা পড়েছিল, নিয়োগ পাওয়া তিনজনের নাম কোথা থেকে এসেছে, তাদের নিয়োগে বিবেচনা কী— এসব কিছুই জানানো হয়নি। কেউ কেউ বলছেন, দুদকের এই নিয়োগ উৎসাহজনক নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, আপিল বিভাগের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির দুদকের প্রধান পদ গ্রহণ করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, দুদক কোনো বিচারিক বা আধা বিচারিক সংস্থা নয়, এটি একটি তদন্তকারী সংস্থা। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতি দুদকের শীর্ষ পদে থাকলে তা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে। তিনি বলেন, যে মূল্যবোধ ও সততা সমুন্নত রাখার প্রত্যাশা একজন সাবেক বিচারপতির প্রতি রয়েছে, দুদকের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করা সেই মূল্যবোধ ও সততার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠবে। সূত্র: প্রথম আলো

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.