Sylhet Today 24 PRINT

ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় চার খুন: জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ২৩ আগস্ট, ২০২৬

রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় এক পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ।

ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তারা। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়। রবিবার (২৩ আগস্ট) বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

আটক দুই যুবক হলো- সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩)। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। রবিবার ভোরে নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। তাদের বাড়ি নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আশপাশে।

পুলিশ জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করে। আর সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি জুয়েলারি দোকানে প্রায় আট বছর ধরে কারিগর হিসেবে কাজ করছে।


হত্যায় জড়িতরা যেভাবে ধরা পড়লো

পুলিশ বলছে, চার জনকে হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সিআইডি যৌথভাবে কাজ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই রহস্য উদ্ঘাটন করে।

পুলিশ কমিশনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত দল ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু বা আলামত সংগ্রহ করে, যা অপরাধীদের শনাক্ত করতে সরাসরি সাহায্য করেছে। বিশেষ করে বাড়ির ছাদে ইয়াবা বা মাদক সেবনের স্পষ্ট আলামত পায় পুলিশ। এ ছাড়া খুনিরা ঘরে থাকা ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছিল এবং সেখানে খেজুরের বিচিও ফেলে যায়। খেজুরের বিচি ও কামড়ানো অর্ধেক শসা ফেলে যায় তারা। আবার ঘর তল্লাশির সময় আগুন দিয়ে টেস্ট করা বা পোড়ানো স্বর্ণের চুড়ি পাওয়া যায়। এটি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, ঘটনার সঙ্গে স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ স্থানীয় কেউ জড়িত আছে।

পুলিশ বলছে, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার পরিবারের সঙ্গে কারও কোনও কলহ বা বিরোধ ছিল না। পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাদের বাড়ির ছাদে আসে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সেখানে বসে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। ছাদে শব্দ শুনে গণপতি সেখানে যান। তিনি খালি গায়ে ছিলেন এবং কাঁধে একটি গামছা ছিল। ছাদে বসে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন। এ সময় নিজেদের পরিচয় যাতে প্রকাশ না পায়, সেজন্য তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে তারা।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির তৃতীয় তলার ছাদে ওঠে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী তৃতীয় তলার খোলা ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবনে বাধা দেয়। এ সময় ওই দুই তরুণ গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। পরে গণপতি চক্রবর্তীর চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) তৃতীয় তলার ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরে বাসায় ঢুকে ঘুমিয়ে থাকা ১৩ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

নিহতদের সঙ্গে আটক দুই যুবকের আগে থেকেই পরিচয় ছিল উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে।’

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘তিন জনকে হত্যার পর বাসায় ঢুকে কিশোর আয়ুশ চক্রবর্তীকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। একপর্যায়ে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।’ শিশুটির বয়স নিজের সন্তানের সমান উল্লেখ করে আবেগাপ্লুত হন পুলিশ কমিশনার।

এর আগে শনিবার রাতে ওই বাড়ির দোতলা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গণপতি চক্রবর্তী পরিবার নিয়ে বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। ভবনটির প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ আছে।

হত্যা শেষে বাসাতেই গোসল করে খুনিরা, খায় খেজুর-শসা

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, ‘হত্যার পরও ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা গোসল করে, ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং ইয়াবা সেবন করে। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে আলমারি ও ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেয়।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঘরের টেবিলের ওপর ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। পাশাপাশি একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছে। নিহত পরিবারের লুট হওয়া স্বর্ণালংকার ওই দুই যুবকের দেখানো একটি পরিত্যক্ত জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, নিহত শিক্ষকের বাসায় থাকা দুটি মোবাইল ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে। ঘরের ভেতর থেকে খেজুরের বিচি জব্দ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুদিন ধরে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের। শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান শ্যালিকা। সেখানে গিয়ে দেখেন বাড়ি তালাবদ্ধ। জানালা দিয়ে দেখেন এলোমেলো ঘর। বেশ কিছুদিন ধরে বাড়িটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। পরে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়ির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে চার জনের মরদেহ উদ্ধার করে। স্থানীয়রা আরও জানান, নিহত গণপতি চক্রবর্তী শিক্ষকতা থেকে অবসর নেয়ার পর নিজ বাসায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন।

রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, ‘এ ঘটনায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে। একইসঙ্গে আটক দুজনকে জবানবন্দি দেওয়ার জন্য আদালতের পাঠানো হবে।’

এদিকে, চার জনের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন। তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.