সিলেটটুডে ডেস্ক | ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
সারা দেশের সরকারি স্কুল ও কলেজগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘদিন ধরে অব্যয়িত অবস্থায় পড়ে থাকা অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ছাত্র সংসদসহ ভর্তি পরীক্ষার সময় আদায় করা বিভিন্ন তপশিলভুক্ত খাতের এই অলস অর্থ হস্তান্তরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে তাগিদপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে আপত্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের। তাদের দাবি, এ অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত এবং তাদের স্বার্থেই তা পর্যায়ক্রমে ব্যয় করা হয়; যা সরকারি কোষাগারে নিলে প্রতিষ্ঠানগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়বে। সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, দেশের মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীরা প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি আলাদা খাতে ফি প্রদান করে থাকেন। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতা ও নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় এসব ফান্ডের একটি বড় অংশ অব্যয়িত থেকে যায়। এই টাকা এবার নিতে সরকার সরকার। এজন্যে নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ।
রাজধানীসহ সারা দেশের ২৮টি কলেজ মন্ত্রণালয়ে হিসাব জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কলেজের অব্যয়িত টাকার একটি হিসাবের সূত্রে দৈনিক কালবেলা পত্রিকা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ছাত্র সংসদ কার্যকর না থাকা সত্ত্বেও ছাত্র সংসদ খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত আদায় করা ১০ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৭২ টাকা অব্যয়িত অবস্থায় আছে। এ ছাড়াও তপশিলভুক্ত বিভিন্ন খাতে আদায় করা আরও ৯২ কোটি ৫৯ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৫ টাকা অব্যয়িত অবস্থায় আছে। অর্থাৎ ২০ প্রতিষ্ঠানেই অব্যয়িত অবস্থায় আছে শতকোটি টাকার বেশি। সব প্রতিষ্ঠান হিসাব করলে এই টাকার পরিমাণ হাজার কোটির বেশি হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই অব্যয়িত টাকা সরকারের কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি মন্ত্রণালয়ের।
বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪-এর তথ্যমতে, দেশে একসঙ্গে স্কুল ও কলেজ থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৪টি। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ৬৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮৮ হাজার ১০৩ জন। আর কলেজের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৬২টি। এর মধ্যে সরকারি ৬৪২টি। এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় ২৬ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। মাউশির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, ভর্তির সময় বিভিন্ন খাতে টাকা নেওয়া হলেও সব খাতের টাকা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। আবার এক খাতের টাকা অন্য খাতে খরচ করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে দীর্ঘদিন থেকে বড় অঙ্কের এ টাকা অব্যয়িত অবস্থায় পড়ে আছে। তাই হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরসহ তদন্ত সংস্থাগুলো অডিটে গেলেই এ অব্যয়িত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে। ফলে দীর্ঘদিন পর সরকারের হয়তো মনে হয়েছে এই টাকা নিয়ে অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করা যাবে, তাই নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অভ্যন্তরীণ সংস্থাগুলোর মতে, অর্থ বিধি অনুযায়ী প্রতি বছরের অব্যয়িত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ টাকা জমা না দেওয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি মন্ত্রণালয়ের। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান বলেন, নিয়ম হলো প্রতি বছরের অব্যয়িত টাকা প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে এই টাকা জমা দেওয়া হচ্ছে না। তাই অব্যয়িত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য মাউশির মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ টাকা জমা না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সরকার যেখানে অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিতে উদ্যোগী, তখন ভিন্নমত পোষণ করছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, করোনা মহামারী এবং সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের কারণে বিগত বছরগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক না থাকায় বিভিন্ন ফান্ডের টাকা ব্যয় করা যায়নি, যে কারণে ব্যাংকে টাকার অংক বড় দেখাচ্ছে। তারা বলছেন, সরকারি জনবল কাঠামোর বাইরে বাধ্য হয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ, আসবাবপত্র মেরামত, অবকাঠামোগত জরুরি কাজ কিংবা বার্ষিক ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের ফান্ড এ অর্থ থেকেই মেটাতে হয়। সব টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চলে গেলে দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যাহত হবে।
একধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানেরা সরকার টাকা নিতে চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই টাকা যাতে দিতে না হয় সেজন্য নবগঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধিভুক্ত সাত কলেজসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়েছেন। দফায় দফায় এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কে এম ইলিয়াস বলেন, ছাত্র সংসদ ফি নেওয়া এখন বন্ধ রয়েছে। তবে টাকা মন্ত্রণালয় নিয়ে নিতে চায়। তারা বিষয়টি তদারকি করছে।
বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের টাকা জমা দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে। এরপর আমরা অধ্যক্ষরা মিলে ঢাকা অডিট অফিসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিটিং করে বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। আমরা বলেছি, এক বছর হয়তো ফান্ডের টাকা খরচ করতে না পারলে পরের বছর করা হয়। আবার কোনো বছর টাকা কম উঠলে আগের বছরের টাকা থেকে সমন্বয় করা হয়। তারা বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলেছেন। এখন সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে তা আমরা মেনে নেব।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, যে টাকাগুলো নেওয়া হয় তা ছাত্রদের কল্যাণেই খরচ হয়। তবে করোনা ও অন্যান্য কারণে আমাদের কলেজের কিছু টাকা খরচ হয়নি। এ ছাড়াও আমাদের কলেজে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার শেখানোর জন্য একটি ডিজিটাল ফান্ড ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয় একটা থোক বরাদ্দ দিয়েছিল। সেই টাকা খরচ করা হয়নি। এখন সব টাকা সরকার চাচ্ছে। আমরা বিষয়টি বিবেচনার জন্য চিঠি দিয়েছি। দেখি কী হয়।’
মাউশির বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘ভাবনাটা একেক জনের একেক রকম। সরকার ভাবছে এই অর্থ কোষাগারে নেওয়ার কথা, আর প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা ভাবছে না দেওয়ার কথা। কারণ স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী বেশি থাকার কারণে জনবল কাঠামোর বাইরেও খণ্ডকালীন অনেক লোক নিয়োগ দিতে হয়। তাদের বেতন এসব ফান্ড থেকে দিতে হয়। আবার অনেক খাতে হঠাৎ করে ব্যয় করা প্রয়োজন হয়। যদি সরকার টাকা নিয়ে যায় তাহলে সংকটে পড়তে হবে। তাই সরকার টাকা না নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটা নীতিমালা করে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে।