সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে পদদলিত হয়ে ৬ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রচারিত হওয়ার পর, এই তথ্য নাকচ করেছে প্রশাসন। ঘটনার পর চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন— এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করছে প্রশাসন।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে পরিবার নিশ্চিত করেছে। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় অনেকে হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আহত হন। এরপর পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতাল পরিদর্শন করে রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির ও ময়মনসিংহ–৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা গেছেন— এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। আমরা ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের রেজিস্টারও যাচাই করেছি। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পাঁচজনের মৃত্যুর একটি তালিকার বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির বলেন, এর মধ্যে একজন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ চিকিৎসকেরা এখনো স্পষ্টভাবে জানাতে পারেননি। এ বিষয়ে তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।
কমিশনার আরও বলেন, এ ঘটনায় কোনো মৃত্যু হয়েছে— এমন তথ্য-প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে রোগী মারা যেতে পারেন। তবে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্যটি অসত্য।
এ সময় তিনি জানান, হাসপাতালে জরুরি বিভাগ, মর্গের তথ্য ছাড়াও তার কাছে আরও একটি তালিকা রয়েছে। সবগুলো যাচাই-বাছাই শেষ প্রকৃত পরিস্থিতি বলা যাবে।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তারা সব বিষয় দেখবে।
তবে আগুনের পর হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হওয়ার কথা জানান বিভাগীয় কমিশনার। তাদের কারও হাত-পা কেটে যাওয়া বা মাথায় আঘাত লাগার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তিনি। ধোঁয়ায় কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।
হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির একটি বন্ধ থাকার কারণে রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়েন— এমন অভিযোগের বিষয়ে কমিশনার বলেন, বিষয়টি তারা জেনেছেন। নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালের কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হাসপাতালের কোনো অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, মৃত ব্যক্তিদের তালিকায় এমন একজনের নাম রয়েছে, যিনি এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি সাংবাদিকদের ওই রোগীকে দেখে তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, জাহানারা নামে যে রোগীর নাম মৃতের তালিকায় দেওয়া হয়েছে, তিনি জীবিত। তিনি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তালিকার সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
এদিকে হাসপাতালে আগুন লাগার পর আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ির সময় সিঁড়িতে পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন দুজনের স্বজন। তারা হলেন তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং ফুলপুরের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫)।
সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে তারাকান্দার কুলসুম আক্তারের ননদ নাজমা আক্তার বলেন, কুলসুম ১২ দিন ধরে তার জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালের ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। কুলসুমের সঙ্গে তার ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিমও ছিলেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নাজমা বলেন, আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে লোকজন ছোটাছুটি শুরু করলে কুলসুম তার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। মিম আগে বের হয়ে যান। পরে তিনি ফিরে এসে দেখেন, লোকজন তার ভাই স্বাধীনকে টেনে বের করছেন; কিন্তু মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
নাজমা বলেন, পরে কুলসুমকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তখনো তার শ্বাস ছিল। খবর পেয়ে নাজমা হাসপাতালে আসার পথে ছিলেন। এর মধ্যেই কুলসুমের মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিযোগ আছে।’ হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তারা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে শাহাজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার ছেলে পলাশ মোল্লা বলেন, আগুন লাগার সময় তার বাবা, মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তার একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় পেছন থেকে লোকজনের ধাক্কায় তারা পড়ে যান। পরে তার মা ও খালাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুজনই বর্তমানে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।
সোমবার রাতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ছয়জনের মৃত্যুর কথা শুনেছেন। বিষয়টি খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় লিফটের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে ১০টি ইউনিট কাজ করে।
এদিকে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য প্রচারের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার।