Sylhet Today 24 PRINT

একে একে বিদেশিদের হাতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের সব কন্টেইনার টার্মিনাল

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০৪ অক্টোবর, ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনালগুলো বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সে উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে। ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার সে একই পথে হাঁটছে। চারটি টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইতিমধ্যে দেওয়া বা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর এখন চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল—এই তিনটিতেও বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে।

পতেঙ্গা, লালদিয়ার চর ও পানগাঁও আইসিডি—এই তিন টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ আগেই দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার উচ্চপর্যায়ের সভায় আলোচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে টার্মিনালগুলো হস্তান্তরের তীব্র বিরোধিতাকারী সংগঠনগুলো নতুন করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। বন্দর, কাস্টমস ও প্রেসক্লাব এলাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা একের পর এক কর্মসূচি নিচ্ছেন।

নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া গত শুক্রবার বলেন, বন্দরের টার্মিনালগুলোতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ সরকারের নিয়মিত কাজ। সরকার ইতিমধ্যে তিনটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দিয়েছে। ইতিমধ্যে পতেঙ্গা টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপারেশনে চলে গেছে। ডিসেম্বরে পানগাঁও আইসিডি পুরোদমে অপারেশনে যাবে। এখন আরও তিনটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

নৌপরিবহনসচিব বলেন, বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালিত হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে এবং শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা পাবে।

তবে সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে শ্রমিক নেতারা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পিপিপির আওতায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের কাছে দেওয়ার বিষয়টি নীতিগতভাবে অনুমোদন করে সরকার। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রকল্প প্রোফাইলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই সরকারের মনোনীত অপারেটর হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম রয়েছে। কমিটির বৈঠকে স্বাক্ষরিতব্য কনসেশন চুক্তির খসড়া উপস্থাপন করা হয়।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪% করেছে এনসিটি। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে এটি এককভাবে সবচেয়ে বড় টার্মিনাল।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল পরিচালনা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে আরএসজিটিআইকে টার্মিনাল তিনটির অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়।

এ বিষয়ে বন্দর সচিব সৈয়দ কেফায়েত হামিম বলেন, ‘এগুলো যেহেতু সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার, তাই আমি কোনো মন্তব্য করছি না।’

এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এক দিনেই লালদিয়ার চর ও পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং সুইজারল্যান্ডের মেডলগকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পানগাঁও টার্মিনালের বার্ষিক হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টিইইউয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের চাহিদা মেটাতে মেডলগ টার্মিনালের সুবিধা বাড়াবে।

ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসকে ৪৮ বছরের কথা মাথায় রেখে নিয়োগ দেওয়া হয়। এপিএম ২০৩০ থেকে পরবর্তী ৩০ বছরের জন্য টার্মিনালটি চালাবে। মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর নবনির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার কাজ ২২ বছরের জন্য রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালকে (আরএসজিটিআই) দিতে চুক্তি সই হয়।

পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে সরকার। কিন্তু এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন শ্রমিক-কর্মচারী নেতারা। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন গতকাল শনিবার বলেন, বন্দরের টার্মিনালগুলোতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করা হলে সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃত্ব হারাবে। জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত ও দেশীয় কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।

একই বিষয়ে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, ‘বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ হলে বন্দর দেউলিয়া হয়ে যাবে। শ্রমিকেরা চাকরি হারাবে।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদনের পরও বন্দর রক্ষা কমিটি এর তীব্র বিরোধিতা করে।

বন্দর রক্ষা কমিটি গতকাল শনিবার এনসিটি ও এর ওসিওয়াই আন্তর্জাতিক অপারেটরের কাছে দিতে চুক্তির প্রক্রিয়া বাতিল এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, এনসিটিকে ১৫ বছরের জন্য কনসেশনে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের আগে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এর পরিচালনার সম্ভাব্য আয়, সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কনসেশনে দিলে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তুলনামূলক মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

বন্দর রক্ষা কমিটি বলেছে, জাতীয় কৌশলগত অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, রাজস্ব, কর্মসংস্থান, শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত স্বাধীনতা যথাযথভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সূত্র: আজকের পত্রিকা।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.